
উত্তরাধিকারসূত্রে অন্তর্বর্তী সরকার একটি পঙ্গু অর্থনীতি হাতে পেয়েছিল। এর পরের ১৫ মাসে অর্থনীতির ক্ষত কিছুটা সেরেছে, কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ-সবল হয়নি। ফলে নির্বাচনের পরে নতুন সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে একটি গতিহীন অর্থনীতিই হাতে পাবে। বিনিয়োগে মন্দা এর প্রধান কারণ। বিনিয়োগে এতটা মন্দাবস্থা অনেক বছর দেখেনি বাংলাদেশ।
জ্বালানিসংকট, আর্থিক খাতের দুরবস্থা, উচ্চ সুদহার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম হারে মজুরি বৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতা কম—এসব সমস্যা তো অর্থনীতিতে আছেই। তবে বর্তমান সরকারের সময় যুক্ত হওয়া বড় দুটি উপাদান হচ্ছে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। এতে তৈরি হয়েছে আস্থাহীনতা। এ কারণে অর্থনীতি গতিহীন, বিনিয়োগ নেই, হয়নি বাড়তি কর্মসংস্থান। ফলে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধিও সামান্য।
পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন বাংলাদেশেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে গত অক্টোবরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ।
সাফল্যও আছে
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। প্রবাসী আয় বেড়েছে, শুরুতে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল, যদিও এখন আবার কমছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকানো গেছে। তবে আমদানি এখনো অনেক কম। এ কারণে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ভারসাম্য ফিরে এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ডলারের দর সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় এক জায়গায় স্থির হয়ে ছিল। এরপর আরও কিছুটা বেড়ে সেই উচ্চ দরেই ডলার এখন স্থিতিশীল আছে। এই সুযোগে বিনিময় হারকে প্রায় বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগও কিছু বেড়েছে। ফলে বলা যায়, আগের সরকারের সময়ের তুলনায় সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবশ্যই উন্নতি হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি
অবশ্য সাধারণ মানুষের জীবন খুব একটা স্বস্তিদায়ক হয়নি। মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের বেশি। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন বাংলাদেশেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে গত অক্টোবরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। পাশের দেশ ভারতে এই হার এখন দশমিক ২৫ শতাংশ। দেউলিয়া অর্থনীতি থেকে ফিরে আসা শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ১ শতাংশ।
জেন-জির বিক্ষোভে নেপালে ওলি সরকারের পতন ঘটলে গত ১২ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেয় একটি অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকার এরই মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা দিয়েছে, যা হবে আগামী ৫ মার্চ। ফলে কেটেছে অনিশ্চয়তা। এর প্রভাবও আছে মূল্যস্ফীতিতে। এই হার ১ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের মানুষ কি আসলেই মনে করে যে বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমবে। যদিও দেখা যাচ্ছে যে সরকারের পরিচালন ব্যয় আরও বেড়েছে। কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা নেই।
বাংলাদেশের মানুষকে দুর্ভাগাই বলতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সাধারণ মানুষকে থাকতে হচ্ছে। সংকট শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে কোভিডের সময় থেকে। এর পরের পাঁচ বছর ধরে বজায় আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কম মজুরি বৃদ্ধি। এতেই কমে গেছে মানুষের প্রকৃত আয়, বেড়েছে দারিদ্র্য। বেসরকারি জরিপ বলছে, দেশে এখন দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবে ২০২২ সালে যা ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
কোভিড ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পড়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশই সুদহার বাড়িয়ে মুদ্রা সরবরাহ কমিয়েছে। এর ফলও পেয়েছে তারা। অথচ সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার উল্টো মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগ হয়। তিনি এসেই নীতি সুদহার বাড়িয়ে চলেছেন। এতে মূল্যস্ফীতি কমেছে, তবে গতি শ্লথ।
প্রশ্ন হচ্ছে, বেসরকারি বিনিয়োগ হচ্ছে না কেন। এর অনেক কারণ। জ্বালানিসংকট, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আমলাতন্ত্র, ডলারের দর—এসব তো আছেই। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, সমসাময়িক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা এর বড় কারণ।
মানুষ কতটা আস্থা রাখছে
অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বলে একটি বিষয় আছে। সরকার যতই আশ্বাস দিক, মানুষ নিজের খরচ, সরকারের ব্যয়, বাজেট ও করনীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার নীতি, পণ্যের ঘাটতি বা সরবরাহ সমস্যা, জ্বালানি ও ডলারের দর পরিস্থিতি—এসব দেখে ধরে নেয় সামনের দিনে মূল্যস্ফীতি বাড়বে না কমবে। বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির দেশ মূল্যস্ফীতির এই প্রত্যাশা সূচক অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করে। বাংলাদেশে এ নিয়ে খুব একটা কাজ হয়নি।
প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের মানুষ কি আসলেই মনে করে যে বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমবে। যদিও দেখা যাচ্ছে যে সরকারের পরিচালন ব্যয় আরও বেড়েছে। কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা নেই। বিশাল বহর নিয়ে বিদেশ সফর হচ্ছে। বিপুল খরচ করে পুলিশের পোশাক বদলানো হয়েছে। অথচ মানুষ বাজারে গিয়ে দেখছে যে জীবনযাপনের খরচ ক্রমাগত বাড়ছে। সেই তুলনায় আয় বাড়েনি। চাকরির বাজার সংকুচিত। অনেক ব্যাংক থেকে আমানতের টাকা তোলা যাচ্ছে না। এতে আস্থা কমছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার কঠোর নয়। আছে নানা অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। ফলে মূল্যস্ফীতি অনেক কমবে, এমন প্রত্যাশা মানুষের মধ্যে খুবই কম।
দেখা যাচ্ছে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ব্যাপক হারে ঋণ নিয়ে বাজেটঘাটতি মেটাচ্ছে। সরকারের আয় নেই, ব্যয় বেশি। এর আগে ২০২৩ সালের জুনে সরকার রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিয়ে বাজেটঘাটতি মিটিয়েছিল।
সবচেয়ে অস্বস্তিকর দুই সূচক
অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সরকারি খাতের ঋণ নেওয়ার প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আর এখন সরকারি খাতের ঋণ বেড়ে হয়েছে ২৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের ঋণ কমে হয়েছে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ব্যাপক হারে ঋণ নিয়ে বাজেটঘাটতি মেটাচ্ছে। সরকারের আয় নেই, ব্যয় বেশি। এর আগে ২০২৩ সালের জুনে সরকার রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিয়ে বাজেটঘাটতি মিটিয়েছিল। সেই হার ছিল প্রায় ৩৫ শতাংশ। এর পরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ডটি করল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার।
এর বিপরীতে বেসরকারি খাত উপেক্ষিত। কমে গেছে বেসরকারি খাতের ঋণ। বিনিয়োগে মন্দার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই সূচক। বলা হচ্ছে গত দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণে প্রবৃদ্ধি এবারই সবচেয়ে কম। এটা ঠিক যে সরকার সুদহার বাড়িয়েছে। তবে বাংলাদেশে সুদহারের ওপর বিনিয়োগ কখনোই নির্ভরশীল ছিল না। তবে এটা ঠিক যে সুদহার কমলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা লাভবান হতে পারতেন। এ কারণে ১০ নভেম্বর মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার-সংক্রান্ত সমন্বয় কাউন্সিলের বৈঠকে অর্থ, পরিকল্পনা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সুদহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এখনই সুদহার কমানোর বিপক্ষে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বেসরকারি বিনিয়োগ হচ্ছে না কেন। এর অনেক কারণ। জ্বালানিসংকট, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আমলাতন্ত্র, ডলারের দর—এসব তো আছেই। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, সমসাময়িক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা এর বড় কারণ। বেসরকারি খাতের আস্থাহীনতা দূর করতে সরকার তেমন কোনো পদক্ষেপও নেয়নি। এই আস্থাহীনতা দূর না হলে বিনিয়োগে জড়তা কাটবে না।
একদিকে সরকার ঋণ নিয়ে বেশি ব্যয় করছে, অন্যদিকে কমে গেছে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এমনিতেই গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল সাম্প্রতিক সময়ে সর্বনিম্ন। উন্নয়ন বাজেটের এই করুণ দশার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও চাঞ্চল্য আসছে না। নতুন কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে না।
আরেক দুশ্চিন্তা খেলাপি ঋণ
এশিয়ায় এখন শীর্ষ ঋণখেলাপির দেশ বাংলাদেশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) গত সেপ্টেম্বরে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে তাদের তথ্য ২০২৩ সালের, তখন খেলাপি ঋণ ছিল ৯ শতাংশ। সেই খেলাপি ঋণের হার বেড়ে এখন ২৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এর চেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ আছে ইকুয়েটরিয়াল গিনির ৫৫ দশমিক ৪১ শতাংশ, সান মারিনোর ৫৩ দশমিক ১৪ শতাংশ, ইউক্রেনের ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং চাদের খেলাপি ঋণ ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ।
আওয়ামী লীগ সরকার ধ্বংসপ্রায় ব্যাংক খাত রেখে গিয়েছিল। নতুন সরকার লুকানো খেলাপি ঋণ প্রকাশ্যে এনেছে, এটি একটি ভালো দিক। তবে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এ বছরের শুরুতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করেছে। কমিটি ২৮০টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের সুপারিশ করেছিল। তবে জানা গেছে, সুপারিশ থাকলেও একাধিক সরকারি ব্যাংক তা মানছে না। বরং কারও কারও বিরুদ্ধে এ নিয়ে বাণিজ্যেরও অভিযোগ উঠেছে।
বেশ কিছু ভালো ব্যাংক আর অনেকগুলো খারাপ ব্যাংক নিয়ে বিপাকেই থাকতে হবে দেশকে। পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার পরিকল্পনা সফল করাও সহজ হবে না। এই খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা আরেক সমস্যা। এ জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা হচ্ছে। রাজনৈতিক সরকার এলে এই আইন বাস্তবায়ন করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ
নতুন নির্বাচিত সরকার একটি গতিহীন অর্থনীতিই হাতে পাবে। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির অনেকগুলো সূচক স্থিতিশীল আছে। এর ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। এ জন্য অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা দূর করাসহ বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আর্থিক খাত ঠিক করাও জরুরি। আবার বিনিয়োগ বাড়লে, আমদানিও বাড়বে। এতে ডলারের দর ও রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে। এখন ডলারের চাহিদা কম বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। চাহিদা বেড়ে গেলে তা সামাল দিতে রপ্তানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হবে। অর্থাৎ সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে সরকারকেই।
সব মিলিয়ে নতুন সরকারের জন্য অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ অনেক। এই চ্যালেঞ্জ কতটা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা যাবে, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।
Discover more from পথের দাবী
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
