
দেশে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতনে এদেশের সাধারণ মানুষ, যে আশাবাদে উজ্জ্বীবিত হয়েছিলো তা দিন যতই গেছে বা যচ্ছে তা ততো ফিকে হতে শুরু করেছে। একে ঘিরে প্রশ্ন আসাটা খুবই স্বাভাবিক যে, তাহলে আমরা প্রায় ষোল বছরের জগদ্দল চেপে বসা একটি রাজনৈতিক দলের স্বেচ্ছাচারিতার ভেতর দিয়ে জনগণের সম্পদ লুটের যে তাণ্ডব দেখলাম এবং তাকে আড়াল করার জন্য অপরাজনীতি, অপকৌশল এবং চারিদিকে তার বিরুদ্ধে কথা বলাকে গলা টিপে ধরার যে সংস্কৃতি দেখলাম- তার থেকে পরিত্রাণ পেলাম কি? এবং এ তাণ্ডবটা চলেছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিপক্ষের বলে জনগণকে ভাগাভাগি করার মধ্যদিয়ে।
এই তক্ততাওস যারা কাঁপিয়ে দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে সেই সরকার ব্যবস্থাকে- তারা হলো আমাদের যুব সমাজ। আমরা লক্ষ্য করি এই অগ্রসৈনিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমনই শুধু নেমে আসেনি, তাদের বিরুদ্ধে অপরাজনৈতিক কৌশলও সাথে সাথে প্রয়োগ হতে দেখা যায়। তাদেরকে ফান্ডামেন্টালিস্ট, আই এস, এবং জঙ্গিবাদী রাজনীতির অংশ বলেও ব্রান্ডিং করা শুরু হয়।
এ থেকে প্রমাণিত হয় যে জনগণের সংগ্রাম, সাংগঠনিকভাবে সংগঠিত কর্মসূচিভিত্তিক একটি রাজনৈতিক সংগ্রামাকারে পরিচালিত না হয়ে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন হলে সেটা রাজনীতির অপকৌশলের ফাঁদা ফাঁদে পড়তে বাধ্য। এবং ক্ষমতাটা শাসক শ্রেণী ও রাজনীতিক প্রতিষ্ঠানের মুঠোতেই থেকে যায়। যা কেবল এদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামেই নয়, বিশ্বব্যাপি এর অজস্র উদাহরণ রয়েছে।
কিন্তু তাই বলে যারা তরুণদের সংগ্রামকে চিরতরে ম্লান করে দিতে চায়, বা বাতিল করে দিতে চায়, তাদের সে অভিলাষ আদৌ সফল হবে কি? হয়তো সাময়িক সুবিধা তারা নিতে পারবে। জনগণ তার ভুল শুধরে নেবেই, সংগ্রামও চলমান থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
অন্তর্বতীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে রাষ্ট্র সুরক্ষার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এ নিয়ে বিস্তর মতামত, বিতর্ক আমরা প্রতিনিয়তই লক্ষ্য করছি। রাজনীতি এমন একটি বিষয় যে, এর মূলে রয়েছে ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, শ্রেণী স্বার্থ, আমলাতান্ত্রিক স্বার্থ, তথা জনস্বার্থের সমাহার। রাষ্ট্র বৈষ্যমবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলে সেটা ব্যক্তি গোষ্ঠী দল আমলাতন্ত্রের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবেই- এটাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সূত্র। জনস্বার্থ সেখানে প্রাধান্য পাবে না, যেটা আমরা স্বাধীনতাত্তোর অনেক সংগ্রাম ও সরকার পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে প্রত্যক্ষ করেছি।
এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক বৈষম্যবাদী ব্যবস্থায় রাজনীতিটা মূলত জনগণকে নিয়েই। যাকে শুধু রাজনীতি নয়, রাজনৈতিক ডিপ্লোমেসিও বলা চলে। আমাদের সমাজের মূল হলো দেশের কৃষক সমাজ। হাজার হাজার বছরব্যাপি এই জনগোষ্ঠী যে ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জন্ম দিয়েছে- তার ওপর ভিত্তি করে তাদের যে সামাজিক জীবন-যাপনের স্তম্ভগুলো রয়েছে তাতে আঘাত করা। সেই সাথে জনগণের মধ্যে বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার যে আলাদা আলাদা পথ মত রয়েছে তাকে উস্কে দেওয়া, অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠের দোহাই পেড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন চাপিয়ে দেওয়া । আরো অজস্র উপায়ে জনগণকে বিভেদ করে রাখার রাজনীতি নতুন নয়- পুরোনোই।
হালের তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত দুএকটির জায়গায়, অবাধ তথ্য স্রোত ধারা, তথ্য প্রচার ও প্রকাশের ব্যক্তিগত সুযোগ, পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ হয়েছে। এটি বিভাজনকে আরো সমৃদ্ধই করেছে বলা চলে। তাতে শাসক শ্রেণী যেন আরো নিরাপদ। কারণ জনগণও ব্যক্তিগত পরিসরে তার ভাবনা ও মতামত ব্যক্ত করতে সোচ্চার। নিজেরাই নিজেদের বোধ বুদ্ধিবিবেচনায় বিরোধে সামিল হচ্ছেন।
রাষ্ট্র যেভাবেই সূচনা ঘটুক না কেন, রাষ্ট্রের গুরুত্ব অনস্বীকার্য তা বলা বাহুল্য। তাই যে কোন দুর্যোগে, সরকার পরিবর্তনে কিংবা রাষ্ট্র রূপান্তরে, রাষ্ট্রকে যুগোপযোগী করে নেয়ার গুরুত্বও সমধিক। এই রূপান্তর কিংবা সংস্কার যাই করা হোক না কেন, সেটার লক্ষ্য বা অভীষ্ট কী? সেটা অবশ্যই জনআকাঙ্খা। একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত সমস্যা সমূহের সমাধান করা। এবারের ’২৪ এর পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটি বেশ আলোচিত হয়েছে, গুরুত্ব কতটুকু পেয়েছে কিংবা সংস্কার কতটুকু হবে, হয়েছে এবিষয়ে বিস্তর মতোবিরোধ, পার্থক্য বিদ্যমান। যতটুকু বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্র সমন্বয়ে সংস্কার প্রশ্নে ঐক্যমত হয়েছে সেটি কতোটুকু জনআকাঙ্খা ধারণ করে তাও প্রশ্নাতীত নয়।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার, রাজনীতিক, রাষ্ট্র, সমাজ স্বীকার করুক আর নাই করুক, আমরা যে আধিপত্যবাদী নয়াঔপনিবেশিক শৃংখলের ভেতর নিয়ন্ত্রণাধীন তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। আমাদের রাজনীতি, রাষ্ট্র, আইন, সরকার, সংস্কৃতি সবকিছুর ওপর এই আধিপত্য রয়েছে। তার বিপরীতে যে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতির শক্ত অবস্থান থাকা দরকার, তার ভিত্তি কি এদেশে গড়ে উঠেছে আমরা বলতে পারি? উত্তর অবশ্যই ইতিবাচক নয়, ফলে আমাদের সব দুর্ভোগের মূল কারণ আমাদের রাজনীতি– এটি স্বীকার করে নিয়েই তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পুরো জাতিসত্তার যে ঐক্যমত দরকার তা হতে হবে সর্বাগ্রে। তার কোন ছাপ বা লক্ষণ কি আমরা দেখতে পাচ্ছি? অথচ এখানে সবাই চাই গণতন্ত্র চালু হোক! এমন উদারনৈতিক গণতন্ত্র হোক যেখানে জনগণ একটি উন্নত ও নিরাপদ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পাবে- যা অসম্ভব। চুয়ান্ন বছরে বার বার তা প্রমাণিত হয়েছে। আমরা কেবল একটি গোষ্ঠী বা শ্রেণীকে প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে কাজে লাগিয়েছি। রাজনীতি ও রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি ধনীক গোষ্ঠী ও কর্তৃত্ববাদী শাসক শ্রেণী বিকশিত হয়েছে এ দেশে। যাদের সাথে সাধারণ মানুষের জীবন মানের পার্থক্য আকাশ-পাতাল।
এই গোষ্ঠী বা শ্রেণীটি এতোই কর্তৃত্ববাদী হয়েছে যে, তারা নিজেরাই কেউ কাউকে মানতে রাজি নয়। গণতান্ত্রিক চর্চার যে অভ্যাস জননির্ভরতা থেকে গড়ে ওঠে, জনগণের কন্ট্রিবিউশনকে সম্মান করে গড়ে ওঠে- সেটা এদেশে হয়নি। এখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সুবিধায় ধনী হওয়া যায় খুব সহজেই। জনগণের ধার ধারার প্রয়োজন পড়ে না। তাই শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন দল কখনোই এদেশের সাধারণ মানুষকে সুন্দর সমৃদ্ধশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দিতে পারে নি। জনগণের রক্তের ওপর দিয়েই একদলের বদলে আরেক দল ক্ষমতাসীন হওয়ার মতো রাজনৈতিক গেমের বলি হতে হয়েছে বারবারই সাধারণ মানুষকেই। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের উৎখাতেও তাই ঘটেছে।
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনের পতনের মধ্যদিয়ে একটা জাতীয়তাবাদী চেতনার ঘ্রাণ আমরা পেলাম, ক্রমশ সেটি ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী ইসলামি জাতীয়তাবাদী চেতনার দিকে মোড় নেয়। সবরকম আধিপত্যবাদ বিরোধি জাতীয়তাবাদী শক্তির অনুপস্থিতির কারণে আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিপরীতে পাল্টা দুষ্টু রাজনীতির হাওয়া এখন আমাদের চারপাশে। এই হাওয়া সাধারণ মানুষের তৈরি নয়, এটি বিভাজিত শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন গ্রুপভিত্তিক রাজনীতিরই প্রপাগাণ্ডার ফলাফল। গণভিত্তিহীন জনবিমুখ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীবাদী রাজনীতি কখনোই জনগণের ওপর নির্ভর করে না। তারা নির্ভর করে তাদের যারা ক্ষমতায় ঠিকিয়ে রাখতে সহায়তা দেবে তাদের সন্তুষ্টির ওপর। সেই আধিপত্যবাদী বিশ্ব মোড়ল ও কর্তৃত্ববাদী দেশসমূহের কৃপার ওপর যাদের ভরসা। তাদের স্বার্থ রক্ষায় কে কতো প্রতিশ্রুতিশীল থাকবে ডিপেন্ডেন্ট থাকবে তার পক্ষে কোন দল কতটুকু জনগণকে সামাল দিতে পারবে সেই বিবেচনায় কোন দলকে ক্ষমতাসীন করা যাবে সেই বিবেচনা কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর ওপরই বর্তায়। এটি তাদের বিবেচনা।
ফলে জনগণের শঙ্কা- কি হবে? কে হবে? কে যাবে? কারা সরকার গঠন করবে? আমাদের কি হবে? আমাদের তো আর কিছু হবে না! আমরা যেই সেই! আমাদের অবস্থা আরো দিনকে দিন খারাপই হবে! এই সব স্বর এখন আকাশে বাতাসে…।
এসবের শক্তপোক্ত কনফিডেনশিয়াল কোন উত্তর কি কোন রাজনৈতিক দল এদেশের মানুষকে দিতে পেরেছে? দিয়েছে? দেওয়ার উদ্যোগ বা ভেবেছে?
ভাবেনি এদেশের ডান-বাম-মধ্যপন্থি রাজনীতির চর্চায় এমন দল ও দলের মৌলিক ও আশু কর্মসূচির বাইরে তারা ভাবতেই পারে না। এ এক ট্রেজিক রাজনীতি বাঙ্গালি জাতির!!!
আসা যাক, সেই মৌল কর্মসূচি অনুযায়ি তারা এখন ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা ও ক্ষমতার জমি দখলের মাস্টার প্লান ও রণকৌশলগতভাবে তার পক্ষে সেন্টিমেন্ট ক্রিয়েশনের কার্যক্রমে ব্যস্ত। তার জন্য প্রচুর শ্রম সময় অর্থ ব্যয় হচ্ছে নিয়তই। আর রাষ্ট্রপক্ষ বা সরকার তাদের তৈরি করা প্রপাগান্ডার তোড়ে রীতিমতো চাপের ভেতর হাসফাঁস করতে হচ্ছে তা দৃশ্যমান। এ যেন রাম রাজত্ব যার যা খুশি চাপিয়ে দেয়ার।
জাতি হিসেবে আমাদের গর্বের বা মর্যাদার যে ভিত্তি- ভাষা-সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ তার বুনিয়াদ এতোই শক্ত যে, তাকে টলানো খুব সহজ নয়, নয় ভুলভাবে তাকে নির্দিষ্ট কোন দল বা রাজনীতির দর্শন কিংবা ওনার বলে চালানোর। পাকিস্তানের বিরুদ্ধ সংগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকারী ভূমিকা থাকায় তারা যে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে পেরেছে জনগণের বৃহৎ অংশের সমর্থনের কারণে, সেটিও বিগত প্রায় ষোল বছরে নিজেদের দুঃশাসনের মাধ্যমে পরিত্যক্ত হয়েছে।
কিন্তু তাই বলে যেসব রাজনীতিক বা রাজনীতিক কর্মীরা ভেবে থাকেন যে, ভাষা-সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধকে ইগনোর করে কিংবা বাতিল এবং পরিত্যাজ্য করে দিয়ে ভিন্ন কিছুর মিশেল দিয়ে নব কোন আইডোলজির পলিশ উৎপাদন করে এদেশে রসালো রাজনীতির দাওয়ায় বেচবেন- তারা ভুল করবেন!!!
রাজনীতি করতে হলে আগে দেশের কৃষ্টি-ভাষা-সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের পাটাতনের ওপর শক্ত করে দাঁড়ানো দরকার, দরকার শুধু নয় এটিই জনগণের দর্শণ বা উপলব্ধিকে বুঝার ভিত্তি। রাজনীতিবিদরা সাংগঠনিক শক্তির জোরে ধরাকে সরা মনে করেন, ভাবেন না, দল না থাকলে ব্যক্তি কি? সিঙ্গুলার ব্যক্তির কোন গুরুত্ব নেই রাজনীতিতে। আর রাজনীতি জনগণের কৃষ্টি-ভাষা-সংস্কৃতি ও দর্শন না বুঝলে সেই রাজনীতিরও কোন গুরুত্ব নেই।
আমরা কোন কোন রাজনৈতিক দল দ্বারা বরং জনগণের কৃষ্টি-ভাষা-সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধি কার্যক্রম ও প্রপাগাণ্ডার তোরজোর দেখছি। হামলা-মামলা-ভাঙ্গচুরের মতো ঘটনা মিডিয়ার গরম খবর হয়ে আমাদের কান ভারি করছে।
তবে এসব কি পতিত স্বৈরশাসনের কোন আভাস দিচ্ছে?
নাকি সেই জায়গায় কোন রাজনৈতিক দল জনপ্রিয়তা বা সেন্টিমেন্ট তৈরি করার অভিপ্রায়ে অতিউৎসাহী হয়ে উঠেছে?
নাকি জাস্টিফাই করার মহড়া চালানো হচ্ছে মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট বুঝবার জন্য?
নাকি আধিপত্যবাদী মিশনের কোন ভেরিফাইড এক্টিভিটি, যা মধ্যপন্থা ও ডান পন্থার রাজনীতির মেরুকরণের পূর্বাভাস!





