নিষুপ্ত জাগরণ

Date:

মোহাম্মদ শামছুজ্জামান

প্রকাশক: রাজিয়া রহমান, জাগৃতি প্রকাশনী, প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৫

শুরুর কথা

নিষুপ্ত জাগরণ অর্থ করলে দাঁড়ায় তন্দ্রাচ্ছন্নতা থেকে জাগরণ কিংবা তন্দ্রাচ্ছন্নতার মধ্যে জাগ্রত মানবতা| আবুল হুসেন সেই জাগ্রত মানবতার নাম| যেটি তৎকালীন ক্ষমতা কাঠামোর সাথে যুক্ত মানুষরা বুঝতে চাননি বা বলা যায় ভয় পেয়ে যান; এই জাগরুক ব্যক্তি হুসেনের বাইরে সাধারণের মধ্যে প্রবেশিত হলে ক্ষমতাসীনদের আক্রান্ত হবার সমূহ ভীতি| ফলে তাকে প্রতিহত করবার চেষ্টা আমরা দেখতে পাই|

লেখক মোহাম্মদ শামছুজ্জামান সেই ক্ষমতা কাঠামোর ভেতর জেগে ওঠা বিকল্প ক্ষমতা কাঠামোর ছবি এঁকে গেছেন এই বইয়ের ভেতর দিয়ে| যা কেবল ব্যক্তি জীবনের বিধৃতি নয়, সমাজ সময় ও ঐতিহাসিক পরিক্রমার এক লিখিত প্রস্তাবনাও বলা যায় ‘নিষুপ্ত জাগরণ’ গ্রন্থটি|

ধর্মের সাথে ক্ষমতা কাঠামোর যে জোট, সে জোটের অনুশাসনে যে বিধি-বিধান, আচার নিষ্ঠতা— যাকে সামাজিকতা বলি, তাকে অস্বীকারের নামে যে কাউকে ক্ষমতাশালীদের তৈরি করা আদালতে দাঁড় করানো কিংবা হত্যা করার যে বৈধতা দেয়!— তা কি ন্যায্য? নিষুপ্ত জাগরণ এ প্রশ্নটি পুনরায় পাঠককে ভাবানোর উদ্যোগ নেয়|

প্রায় ৫৩৬ পৃষ্ঠার মোটা বইটি মানবতাবাদী একজন সাহিত্যিক তথা দার্শনিক মানুষের জীবনকে বিধৃত করতে যেয়ে ঢেলে দিয়েছেন তাঁর অপরিসীম শ্রম ও মেধা| জোগাড় করেছেন বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য উপাত্ত ও মতামত| যা তাঁর রচনাকে বাস্তবতা রূপায়নে সহায়তা দিয়েছে|

বইটিতে আবুল হুসেনের সাথে আরো বেশকিছু ঐতিহাসিক চরিত্র উঠে এসেছে যেমন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, প্রমথ চৌধুরী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আনোয়ারুল কাদির, কাজী আবদুল ওদুদ, আবদুল কাদির, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল সহ অনেকেই|

বইটি ব্যক্তি আবুল হুসেনকে নিয়ে এমনভাবে আবর্তিত হয়েছে, যার সাথে দেশ কাল ও সমসাময়িক মানুষ যারা আবুল হুসেনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন, সেই সাথে সামাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ব্যক্তিত্বরাও বাদ যায়নি| বাদ যায়নি বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ| ব্যক্তি জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, দাম্পত্য সুখ-দুঃখ, শঙ্কা-সাহস, স্বপ্ন ও বাস্তবতার মেলবন্ধনে এটি একটি মহা আখ্যানই বলা চলে| আঙ্গিকের দিক থেকে ‘নিষুপ্ত জাগরণ’ উপন্যাসটি ধ্রুপদ ঐতিহ্যই অনুসরণ করেছে| এর গঠনশৈলী সরল ও সাবলীল| যদিও প্রথম দুটি চ্যাপ্টারে আবুল হুসেনের মধ্যবয়সের বয়ান বিধৃত হয়েছে| তারপর থেকে ৪২টি চ্যাপ্টারের ধারাক্রম রয়েছে|

আবুল হুসেনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মুসলিম সাহিত্য সমাজের যে ঐতিহাসিক ভূমিকা, বাঙ্গালি মুসলিম সমাজের জাগরণকে ঘিরেই তার উদ্ভাস| সেই প্রচেষ্টার অন্যতম উদ্যোক্তা আবুল হোসেন| জন্ম ১৮৯৭ খ্রিস্টব্দের ৬ জানুয়ারি, মৃত্যু ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অক্টোবর| ˆপত্রিক নিবাস যশোর জেলার ঝিকরগাছার পানিসারা গ্রামে| পিতা মাওলানা ˆসযদ মুছা, মাতা আছিরুন নেছা খাতুন| গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষার শুরু পরবর্তীতে ঝিকরগাছা এম.ই. স্কুল শেষে ১৯১০ সালে যশোর জেলা স্কুলে ভর্তি এবং এই স্কুল থেকে ১৯১৪ সালে বৃত্তিসহ প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ করে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন| ১৯১৬ সালে আই এ এবং ১৯১৮ সালে বিএ সম্পন্ন করেন| ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন| ১৯২২ সালে বিএল এবং ১৯৩১ সালে এমএল ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি|

১৯১৮ সালের ১৮ এপ্রিল তারিখে গাইবান্ধার শেখ বসিরউদ্দীনের কন্যা মোসাম্মৎ মৌলুদা খাতুনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন| ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা ঘটে এই একই বছরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কমার্স ও অর্থনীতি বিভাগে জুনিয়র লেকচারার পদে যোগ দেন| ১৯২৬ সালে ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর গঠনে প্রধান ভূমিকার পাশাপাশি তিনি এই সংগঠনের সম্পাদকের দায়িত্ব নেন| মুসলিমদের জন্য বেঙ্গলপ্যাক্টে ঘোষিত কনসেশন গ্রহণে আপত্তি জানিয়ে ‘শতকরা পঁয়তাল্লিশ’ নামের প্রবন্ধ রচনা করেন| এতে ঢাকার মুসলিম সমাজের রুষ্টতায় তিনি ১৯২৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে আইন পেশায় যোগ দেন| ১৯৩১ সাল পর্যন্ত তিনি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর সাথে প্রত্যক্ষ জড়িত ছিলেন| ঢাকায় বারবার জীবনের ওপর হুমকি আসায় ১৯৩২ সালে স্বপরিবারে কলিকাতায় চলে যান এবং আমৃত্যু কলিকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন| দীর্ঘ রোগভোগে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অক্টোবর তিনি নিজ বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন| রেখে যান স্ত্রী সহ তিন পুত্র ও তিন কন্যাকে| একাধারে তিনি ছিলেন সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ এবং রাজনীতিবিদ|

লেখক মোহাম্মদ শামছুজ্জামন

লেখক মোহাম্মদ শামছুজ্জামান একজন কথাসাহিত্যিক, কবি ও প্রাবন্ধিক| জন্ম ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি যশোরের ঝিকরগাছায়| প্রাথমিক শিক্ষা যশোর ঝিকরগাছার বাজার প্রাইমারি স্কুল| পরবর্তীতে বি.এম. হাইস্কুল এবং শহীদ মসিয়ূর রহমান ডিগ্রি কলেজে| বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক| বিসিআইসি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডে চাকুরির পর সিভিল সার্ভিসের মাধ্যমে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগ দেন| ২০২১ সালে মাহপরিচালক হিসেবে অবসরে যান| পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরার সুযোগ হয়েছে তাঁর| ব্যক্তিগত জীবনে এক পুত্র সন্তানের জনক| ইতোমধ্যে তাঁর তিনটি কাব্য, একটি নিবন্ধ ও একটি স্মৃতিকথার গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে|

নিষুপ্ত জাগরণ এর পার্সপেক্টিভ

জাগরণের প্রসঙ্গ বা প্রাসঙ্গিকতা এই বইটি পাঠের সাথে বেশ গুরুত্বপূর্ণ| গুরুত্বপূর্ণ এই জন্যে যে, কেন আবুল হুসেন? কেন মুসলিম সাহিত্য সমাজ? কেনই বা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিকাশের প্রসঙ্গ? এগুলো একটির সাথে অন্যটি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত| এই প্রসঙ্গগুলো তৎকালীন আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রিক অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত| শুধু তাই বলা যথার্থ নয়, এটি তখনকার বিশ্বপরিস্থিতি, প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার সাথেও যুক্ত বিষয়| আবুল হুসেনের গড়ে ওঠা ও তাঁর কর্মতৎপরতা ও সৃজনশীল চর্চার সাথে এই পারিপার্শ্বিকতা তাঁর মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে নিঃসন্দেহে| এমন একটি সময়, যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তথাকথিত গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, অভ্যূদয় ঘটেছে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের| প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব বলয়ে ভাঙ্গন, উসমানিয় ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পতন | সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাদেশিক আন্দোলন জোড়ালো হয়ে ওঠা, কলকাতা কেন্দ্রিক সাংস্কৃতি ও রাজনৈতিক শক্তিকে বিভাজিত করে শাসন করার প্রচেষ্টায় বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রশাসনিক উদ্যোগ, তার বিরুদ্ধে গণজাগরণ, কবি রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধি ও নোবেল পুরস্কার লাভ, বেগম রোকেয়ার নারীমুক্তি আন্দোলন ও জাগরণে সাহিত্য সৃষ্টি| নজরুলের বিদ্রোহি কবিতার মাধ্যমে ক্লান্তিহীন সংগ্রামের ঘোষণা ও প্রত্যয়ে কাঁপছিলো পুরো বাংলা তথা ভারতবর্ষ| ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা| ঔপনিবেশিক শাসনের আওতাধীন রাষ্ট্রগুলোতে মুক্তি আন্দোলন তরান্বিত হওয়া| এমন একটি সময়ের স্রোতের ভেতর মুসলিম সমাজ ভাবনা খুবই প্রাসঙ্গিক| ব্যক্তি আবুল হুসেন ব্যক্তিসত্তার উর্ধ্বে উঠে মুসলিম সমাজকে জাগানোর দায়িত্ব অনুভব করেছেন| আজীবন তার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন| আত্মপ্রতিষ্ঠাকে তুচ্ছজ্ঞান করা, জীবন শঙ্কাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে গেছেন ¯স্বীয় প্রত্যয়ে|

‘নিষুপ্ত জাগরণ’ এই পার্সপেক্টিভ থেকে আবুল হুসেনকে কতোটা দাঁড় করাতে পেরেছেন সে প্রশ্নটি পাঠক মাত্রেই উপলব্ধি করবেন বলে আমার ধারণা| একটি বায়োগ্রাফিক্যাল চরিত্র ও সমাজবাস্তবতা তুলে আনায় পুঙ্খানুপুঙ্খ স্মৃতি ও ঘটনার বুননে নিবিষ্ট হওয়া লেখকের পক্ষে শতভাগ সফলতার দাবী পাঠকের দিক থেকে থাকাটা প্রত্যাশিতই বটে| আমি বইটি পড়তে যেয়ে উপলব্ধি করেছি লেখক মোহাম্মদ শামছুজ্জামান আবুল হুসেনের ব্যক্তি জীবনের ছবিটিকে যথাযথ করে সৃষ্টি করার দিকে মনোযোগ কেন্দ্রিভূত করেছেন; সেটা যথার্থই তিনি করতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয়েছে| শৈশব থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি ব্যক্তি আবুল হুসেনের জীবনকে চমৎকারভাবে চিত্রায়িত করেছেন| সে চিত্রটি পাঠক মাত্রই স্মৃতিতে বহন করবেন তা নিশ্চিত বলা চলে|  উত্তমপুরুষ দ্বারা বিবৃত পুরো উপন্যাসটি ঘটনা ও চরিত্র চিত্রায়ন ও কথোপকথনে বাস্তবানুগ করে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন| এতো বড়ো কলেবরে বায়োগ্রাফি বা ইতিহাস নির্ভর রচনা লেখকের সাহসের সাক্ষ্য বলা চলে|

ভূমিকা ও দায় স্বীকার:

‘নিষুপ্ত জাগরণ’ উপন্যাসটির বিষয়ে শিক্ষাবিদ, লেখক ও চিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন— “ বাংলাদেশকে যারা নিজেদের জাতিরাষ্ট্র রূপে গড়ে তুলতে চান, তাদের এই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন তথা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’এর রাজনৈতিক-সামাজিক চিন্তা-চেতনা জানা অপরিহার্য|”

এদিক থেকে ‘নিষুপ্ত জাগরণ’ পাঠককে জানার সেই আগ্রহকে আরো উস্কে দেবে নিশ্চয়| লেখকের ¯স্বীকারোক্তিও এখানে উল্লেখ্য| তিনি শিক্ষাবিদ, আইনবিদ, রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক ও মুসলিম সাহিত্য সমাজের অন্যতম পুরোধা আবুল হুসেনের ৪২ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনের বিশাল কর্মযজ্ঞ ও চিন্তাকে আড়াল থেকে প্রকাশ্যে তুলে আনায় উদ্যোগি হয়েছেন| লেখক মোহাম্মদ শামছুজ্জামান বলেছেন— “ উপন্যাসের তথ্য-উপাত্ত এবং চরিত্রগুলো বাস্তব ও অস্তিত্বসম্পন্ন| উপন্যাসের নব্বইভাগ মানুষ অস্তিত্মত্বপূর্ণ আমাদের পূর্বপুরুষ|”

লেখককে বইটি লেখার জন্য যিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন, তাগিদ দিয়েছেন তিনি হলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক হোসেনউদ্দীন হোসেন| লেখক তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন| দায় ¯স্বীকার করেছেন যারা তাঁকে বিভিন্নভাবে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করেছেন তাঁদের প্রতিও|

লেখক দাবি করেছেন— “ উপন্যাসটি রচনার সময় যতদূর সম্ভব ইতিহাসের প্রাসঙ্গিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও বিষয়গুলো অবিকল তুলে ধরা হয়েছে| কোন মনগড়া বা কল্পনার আশ্রয় নেয়া হয়নি|”

পাঠ প্রক্ষেপন:

উপন্যাসটিতে মোট ৪৪টি আখ্যান বা ধাপ রয়েছে| প্রত্যেকটি ধাপের একটি করে শিরোনাম আছে| প্রথম শিরোনামটিই অত্যন্ত ইঙ্গিতবহ এবং সুন্দর! যেমন: ‘আলোটা আসবে পশ্চিম দিক থেকে, সবাই সেদিকে তাকিয়ে থাকে|’ এই আলো ট্রেনের আলো যেমন নির্দেশ করে সেইসাথে পশ্চিমের জ্ঞানের আলোও নির্দেশ করে|

এখানে স্থান কাল ও ঘটনার বর্ণনায় রয়েছে কাব্যিক উপমা, শব্দ ও বাক্যের মেলবন্ধন| সংলাপে রয়েছে মেদহীন সারল্য| এই ধাপের প্রথম প্যারাটি পড়লেই আমার বক্তব্যের বাস্তবতা আপনারা বুঝতে পারবেন আশা রাখছি|

“রেলওয়ে লাইনে কোন বাঁক নেই, সোজা পূর্ব থেকে পশ্চিমে বনগাঁ অভিমুখে চলে গেছে| অনতিদূরে পশ্চিমে বাঁশঝাড় মাথায় আন্ধার জমিয়ে লাইন বরাবর উঁকি দেয়| রাতে দ্বিপ্রহর শেষপ্রান্তে, দিগন্তে নিশুতি পেয়ে বসেছে| বাঁদুড়ের চলাচলে আবছায়া পরখ করা যায়| কিছুক্ষণ আগেও শেষ আশ্বিনের আকাশ আঁশফলের মতো পরিষ্কার ছিল| এখন শুক্লপক্ষের চাঁদও উদাও, তার অভাবে ধূসর প্রলেপ আকাশে| জোছনার ক্ষয়িষ্ণু নরম আলোর সাথে আসন্ন কৃষ্ণপক্ষের শক্ত আঁচড়ানোর মিশ্রণ এক অদ্ভূত ক্যানভাস, যেন অসতর্কতায় সাদা কাগজে গড়ানো দোয়াতের ছোপছাপ| আকাশ যেন বড়ই নিরীহ শ্যামলা গরুর মায়াবী ছায়া!”

আরেক জায়গায় বিবৃত হয়েছে— “এই আশ্বিনের শেষে কোথা থেকে যেন ভিজে বাতাস উড়ে এসে দলা পাকিয়ে টাকুরের মাথায় দড়িতে পাঁক খেতে থাকে! চারদিকের তরল অন্ধকার চলতি বাদুড়ের ডানা শুষে নেয়| মনে হয় সমস্ত স্টেশন, সামনের বাচড়ার প্রাঙ্গণে দলে দলে অচেনা মানুষের হাহাকার! গবার মাথায় ঝিঁঝিঁ পোকার অবিরত মুখরিত রি-রি ধ্বনি মাঠের মরিচিকার ধোঁয়াশায় পাকাতে থাকে|” এরকম প্রচুর উপমা বা ইঙ্গিত বর্ণনাকে অর্থবহ করে করে তুলে এবং লেখকের কাব্যিক ও দার্শনিক অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটায়|

‘নিষুপ্ত জাগরণ’ এর মূল চরিত্র আবুল হুসেন বিদ্যমান ব্যবস্থার পশ্চাদপদতা, সংস্কার ও তার পৃষ্ঠপোশকতার বিরোধিতা করতে যেয়ে যে লাঞ্চনা ও বিরোধের সম্মুখীন হন তার ন্যারেটিভ বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষিতে তাকে তুলে এনেছেন| আবুল হুসেনের লড়াইটি যে সমাজ কুসংস্কারের বিপরীতে তার দিকে পাঠককে মনোযোগি করার চেষ্টা করেছেন| কারণ লড়াইটি তখন যেমন ছিলো, এখনো আছে| পরোক্ষে তার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা পাঠকের মধ্যে সঞ্চারিত করার প্রয়াস পাঠক মাত্রেই উপলব্ধি করবেন| কিছু ঘটনার বক্তব্য এখানে তুলে ধরা প্রয়োজন| আমি দু-একটি ঘটনা ও বক্তব্যের প্রেক্ষিত এখানে তুলে ধরছি| ‘আদেশের নিগ্রহ’ নামক প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় সংস্কারাচ্ছন্ন মুসলিম ক্ষমতাশালীদের মজলিস ঢাকার নবাব বাড়িতে যে সালিশি ও তথাকথিত বিচারের ঘটনা ঘটে সেখানে লেখক আবুল হুসেনকে নাস্তিক মুরতাদ মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে নফরমানি এবং ধর্মবিরোধি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়| দীর্ঘক্ষণ সওয়াল জবাবের পর আবুল হুসেন তার জবাবে বলেন— “সমাজে যে ইসলাম চালু আছে, ইসলামের যে শরিয়ত চালু আছে, আইনকানুন যা চালু আছে, সেসব সাধারণ মুসলমানদের, কৃষকদের উপকার করতে পারে না, কোন কাজের না| তাই আমি কোরান সুন্নাহর ভিত্তিতে শরীয়ত আইন সংশোধন চাই| সময় উপযোগী শরীয়ত চাই| এটাকে যুগধর্ম বলে|” এতে মজলিশ আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে|

নারীদের পর্দা, সমাজে সুদ চালুর পক্ষাবলম্বনের অভিযোগের জবাবে আবুল হুসেন বলেন— “আমরা মুসলমানদের কোন সুশিক্ষা, সুন্দর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করতে পারিনি| আমরা মেয়েদের শিক্ষিত করে দুনিয়ার আলোর মুখ দেখাতে পারিনি| মাদ্রাসা শিক্ষায় মৌলভি, ইমাম, ফতোয়াবাজ তৈরি হবে| তবে সমাজকে পথ দেখাতে আধুনিক শিক্ষা দিতে হবে, যেন সে কৃষকের ফসলের সমস্যা বোঝে, সে কারখানার উৎপাদন বাড়াতে পারে|” 

মজলিশ তাকে থামিয়ে দেয়| এরপূর্বেও জমিদার কাজেম উদ্দিনের বিচার সভায় তাকে নাকেখত আর মুচলেকার সিদ্ধান্ত ছিলো| নবাব বাড়ির এই মজলিসে তাকে লাহোরের ‘রঙ্গিলা রসুল’ নামক বই প্রকাশের দায়ে অভিযুক্ত রাজপালের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়|

২৯ পৃষ্ঠার শেষ প্যারাটি হঠাৎ করে এসে পড়ে| পূর্বের ঘটনার সাথে এখানে শুরুটা খাপছাড়া ভাব সৃষ্টি করে| এখানে আরো ভূমিকার প্রয়োজন ছিলো| বা এটিকে আরেকটি শিরোনাম দিয়ে শুরু করলে ভালো হতো|

নিষেদের বিড়ম্বনা নিয়ে যে বিড়ম্বনায় আবুল হুসেনকে পড়তে হয় সেটির বিচার বা সালিশি হয় ঢাকার বালিয়াদির জমিদার খানবাহাদুর কাজেম উদ্দীন সিদ্দিকীর বৈঠকখানায়| এখানে আবুল হুসেনের জবাবটি উল্লেখ্য— “প্রত্যেক ধর্মই কতকগুলি নিষেধের সমষ্টিমাত্র| …অসহিষ্ণুতার জুলুম চিরদিন আমাদের ¯স্বাধীন চিন্তাকে প্রতিরোধ করেছে| তাই মুসলমান আজ যুগধর্মের সমস্যায় বিব্রত হয়ে সমস্ত নিষেধকে লঙ্ঘন করেও প্রশস্ত পথ বের করতে পারছে না| …যে সত্যকার ধর্মজীবন মানুষের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা বাড়ায়, সহানুভূতি ও বেদনা জাগায়, তাহা বিকৃত হয়ে গেছে; তার পরিবর্তে ধর্ম জীবনের ভান ও তার বাড়াবাড়ি প্রবল হয়ে আমাদের চিত্ত-প্রকাশের ¯স্বাস্থ্যকর পথগুলি একে একে সমস্ত রুদ্ধ করে ফেলেছে| আমাদের নিকট অন্তঃসারশূন্য নির্মম আচার-অনুষ্ঠানগুলির দৌরাত্ম্যই একমাত্র ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে|”

তার বক্তব্যে মজলিশ সন্তুষ্ট হয়নি| বরং ইসলামের ভিন্নমত মোতাজিলা বিশ্বাসের সাথে তুলনা করা হয়| ইসলামের পথভ্রষ্ট, পাপী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়|

এরপর উপন্যাসের ধারাক্রম আবুল হুসেনের বেড়ে ওঠার বিভিন্ন সময় ও স্থানিক পর্যায়ের বিবৃতি পাই| স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ে তাঁর লেখাপড়ার সংগ্রামের পাশাপাশি সতীর্থ ও শিক্ষকদের সাথে সম্পর্ক, তাঁর লেখালেখি ও সাংগঠনিক কাজের বর্ণানাগুলো অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে উঠে এসেছে| পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্ককের স্নিগদ্ধতার পাশাপাশি ব্যক্তি আবুল হুসেনের চিন্তার গঠনকে লেখক বিবৃত করেছেন|

তুলে এনেছেন ¯স্বদেশী আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের সম্মাননা প্রদান, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, বলশেভিক বিপ্লবের প্রতিক্রিয়ায় কৃষকদের মুক্তির পথ সম্পর্কে হুসেনের ভাবনা, এসেছে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির কথা, জালিয়ানওয়ালাবাগের কথা|

তবে বইটির মূল পাঠাগ্রহ আবুল হুসেনের চিন্তা ও কাজের বিষয়ে| অবহেলিত মুসলিম জনগোষ্ঠী যারা বেশিরভাগই কৃষক| তাদের আর্থিক ও মানসিক উন্নয়নে তার ভাবনা ও কাজ পাঠককে জানতে ও বুঝতে আগ্রহী করে তুলে| মুসলিম কুসংস্কারাচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে তার সংস্কারবাদী চিন্তা তখনকার সমাজ গ্রহণ করতে পারেনি| তিনি মোটেই ইসলাম বিরোধি ছিলেন না| ইসলামের নামে মোল্লাতন্ত্রের ভুল ব্যাখ্যা ও প্রতিক্রিয়াকে তিনি বিরোধিতা করে ইসলামের আধ্যাত্মিকতার প্রতি মানুষকে নিবিষ্ট হতে বলেছেন| তিনি ছিলেন সময় থেকে বহুদূর এগিয়ে| আজো তিনি আমাদের বর্তমান সমাজে কতোটা বরণীয় সে প্রশ্নও পাঠকের মনে উদিত হবে বইটি পড়ার মাধ্যমে| যদিও তার প্রাসঙ্গিকতা আজ যেন আরো দিপ্তী ছড়ায়| মুসলমানের সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে কিংবা আত্মপরিচয়ের সংকট নিয়ে আবুল হুসেনের বক্তব্যটি লেখক উল্লেখ করেছেন ২৩৬ পৃষ্ঠায়| যেমন— “…তারপরেও ইসলাম আরবের, আমরা তো আরব না, মুসলমান মানে আরব না| হুসেন বলে চলে, আমরা ভারতীয়, আবার বাঙালি| আমাদের সংস্কৃতি ভারতের আরবের সংস্কৃতিও সম্পূর্ণ ভিন্ন| তাই আরবের মুসলমানদের সংস্কৃতি-রাজনীতি এখানে চলবে কেন!” আবুল হুসেনের এ প্রশ্ন কি আজো মিমাংসিত হয়েছে আমাদের সমাজে? 

রবীন্দ্র বিতর্কের উত্তরও আমরা পরের পৃষ্ঠায় পাই| মুসলিমদের বঙ্গভঙ্গ সমর্থন এবং রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতাকে কেন্দ্রকরে তাঁর প্রতি যে সমালোচনা আবুল হুসেন তার জবাব দেন এভাবে— “হতে পারে রবীন্দ্রনাথ জমিদার| তবে তার সাহিত্য রচনা তো মানবতাবাদী, সেখানে কোন সাম্প্রদায়িকতা নেই| সেখানে মানুষের মঙ্গলের কথা, প্রকৃতির কথা বলা হয়েছে|” দেখা যাচ্ছে, রবীন্দ্র বিতর্ক তখনো ছিলো, এখনো আছে| এটাই রবীন্দ্রনাথের শক্তিমত্তা| বাঙ্গালী জাতিসত্তা ও অস্তিত্বের শেকড় হিসেবে তিনি যেন দাঁড়িয়ে আছেন মহিরুহ হয়ে| তাঁকে বিরোধিতা না করে যেন প্রতিক্রিয়াশীলতা একপাও এগুতে পারে না| এটি সময়ে সময়ে আমরা লক্ষ্য করেছি|

এখানে মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতার কথাও এসেছে| আবুল হুসেন ক্ষমতাটি কার হাতে যাবে সে প্রশ্নও উত্থাপন করেছেন| “গরীব কৃষকদের তাতে কী লাভ হবে? তিনি মুসলিম জমিদার বা ক্ষমতাশালীদের ক্ষমতা চাননি| তার সামনে বলশেভিক বিপ্লবের উদাহরণ ছিলো| তার ঝোঁক ছিলো সেদিকেই| তিনি সতর্ক করেন এই বলে যে, …ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া রাষ্ট্র কাঠামোয় মৌলিক কোন পরিবর্তন আসবে না| সেই হতদরিদ্র চাষা ভিখারির থালা বয়ে বেড়াবে| নতুন বোতলে পুরোনো মদ ছাড়া কিছু হবে না| চাষাদের কোন লাভ হবে না, বলশেভিক বিপ্লবের মতো হবে না| যতোই ক্ষমতা পরিবর্তন হোক, বৃটিশদের হটিয়ে যারাই ক্ষমতা নিক, লাভ নেই| সহিংস আন্দোলন ছাড়া ক্ষমতা বেহাতে যাবে|”

পরবর্তী ইতিহাস তার এই সতর্কতার বাস্তবতাকে সঠিক বলে প্রমাণ করে| আজো বাংলার কৃষকের মুক্তি ঘটেনি| রাষ্ট্রবিপ্লবে সম্প্রদায়ের চেয়ে শ্রেণী প্রশ্নটি যে গুরুত্বপূর্ণ সেটি আবুল হুসেন বা মুসলিম সাহিত্য সমাজ তখনই উপলব্ধি করেছে|

তৎকালীন ঢাকার বর্ণনাও এসেছে চমৎকারভাবে এই উপন্যাসে, আমি তার কিঞ্চিৎ উদ্ধৃতি দিচ্ছি— “ রেস কোর্সেও ওপাশে রমনা গার্ডেন, সরা রাস্তায় আাদ করা| রেসকোর্সেও দৌড়ের ঘোড়াগুলো খোলা মাঠে চওে বেড়ায়| হুসেন বাসার পথ ধরে| পাশ দিয়ে দুই ঘোড়া জোড়া গাড়ি ছোটে, পিছনে পাইক বন্দুক হাতে| কেউ শুধু ঘোড়ার পিঠে চলে| সবার পোশাক কেতাদুরস্ত, ঘোড়ার খুরে ধুলো উড়ে পাশের পামগাছগুলোর ডালে ধূসর রঙ মাখায়| সামনে কার্জন হল, কিছুদিন আগের ঢাকা কলেজ| এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, …সামনের রাস্তা পল্টনমুখী, আর দক্ষিণের রাস্তা রেললাইন ও চাঁনখার পুল হয়ে লালবাগ| কার্জন হলের বিপরীতে রাস্তার ওপাশে কারুকার্য খচিত মোগলযুগের মসজিদ, চারপাশে বড় বড় শিমুল গাছের ছায়া| … সামনে এগোনের পর রেললাইন পার হলে মালবোঝাই গরুর গাড়ি ক্যাচক্যাচ শব্দে কাপ্তান বাজারমুখী| পশ্চিম বুড়িগঙ্গার নৌকায় আনা খাদ্যশস্য, কাঁচাসবজি সদরঘাটের বোঝাই গরুর গাড়িতে হেলেদুলে লালবাগের রাস্তা ধওে বিভিন্ন মোকামে যায়| সাথে ঘোড়ায় টানা যাত্রী পরিবহনের গাড়িও হৈচৈ তুলে খটাখট চলে| এর মাঝে বেহারা দল পালকিতে কাপড় জড়িয়ে জেনানা বয়ে নেয়| রাস্তার ওপর ভ্রুক্ষেপহীন কুকুরের বিক্ষিপ্ত হল্লা| সন্ধ্যা ঘনায়, বাতিওয়ালা মইকাঁধে কেরোসিনের সড়কবাতি জ্বালাতে ছোটাছুটি রত| … কোতোয়ালির রাস্তার বাতিগুলো আগেই বিদ্যুতায়িত| তবে ঢাকার সব রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতি লাগেনি| হাজারিবাগ, লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, সুত্রাপুর, ওয়ারি, গেণ্ডারিয়া মিলে ঢাকা শহর| প্রায় ৭ লাখ জনসংখ্যার বসবাস”

আলোচনার আরো বহুবিষয় থাকা সত্বেও আমি ইতি টানতে চাই| পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি হবে তাতে| বইটি পড়ে নেয়ার অনুরোধ থাকছে| আমি উপন্যাসের শেষাংশের কিছু উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি- লেখক মোহাম্মদ শামছুজ্জামান বলছেন— “আবুল হুসেন প্রথম দিকে ব্রিটিশ শাসনের বিরোধী ছিলো না, ব্রিটিশ বিরোধী সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করতো না| প্রথমে প্রগতি প্রসঙ্গে কিছুটা পশ্চাৎমুখী| তবে বয়োপ্রাপ্তির সাথে, অভিজ্ঞতা ও বাস্তাবতার সাথে পশ্চাদমুখীনতা আর নেই| স্বদেশ প্রেম তাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থানে নিয়ে যায়|”

তাঁর ছাত্র আব্দুল কাদিরের সাথে কথোপকথনে দেশের ভবিষ্যত নিয়ে তাঁর সংশয় প্রকাশ পায় যেখানে সাম্প্রদায়িকতা একটি অন্যতম উপসর্গ হিসেবে উঠে আসে— আবুল হুসেন কাদিরের প্রশ্নত্তোরে বলছেন—“ …হিন্দু-মুসলমানের সমš^য়ের ভিতর  দিয়ে ভারতীয় জাতিগঠন যেন মুক্তির সাধন— এ হলো রামমোহনের স্বপ্ন| তবে পর্বত সমান প্রতিভাবান বঙ্কিমও সাম্প্রদায়িক| এছাড়া অন্যান্য হিন্দু নেতারাও ছিলেন| পক্ষান্তরে, স্যার সৈয়দের পরিকল্পনা শুধু ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায় ঘিরে| আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিমদের আধুনিক শিক্ষা দিয়েছে বটে, কিন্তু এর আদর্শটা সাম্প্রদায়িক| শুধু স্যার সৈয়দের জন্যই ভারতীয় মুসলিম সমাজ সাম্প্রদায়িকতার দিকে গেল, কথাটা পুরোপুরি সত্য না| অন্যান্য মুসলিম নেতাও এ পথে ছিলেন ও আছেন| তাই সাম্প্রদায়িকতার অপরাধে মুসলমানরাই প্রথমত দায়ী|”

তিনি বিভক্তি চাননি চেয়েছিলেন মিলন| কাদিরের প্রশ্নোত্তরে এমনটি জবাব আমরা পাচ্ছি| তবে বিভক্তি হয়ে গেলেও সাম্প্রদায়িক স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে একসময় আফসোস কাজ করবে| অতীত চিন্তায় ফিরা কিংবা সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বিরোধ প্রশমিত হয়ে মিলনের ইচ্ছা জাগবে এটি ছিলো তাঁর আশাবাদ| তার আগে তিনি মানুষকে আধুনিক হতে হবে এই কথা বলে গেছেন|

যদিও আমরা আজ ভিন্ন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি| আমারও তাঁর আকাঙ্খার সাথে সহমত জানিয়ে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে মানুষ আধুনিক হয়ে উঠুক, পুরোনো ভেদবুদ্ধি ও কূপমুণ্ডুকতা মুক্তো হোক|

নিষুপ্ত জাগরণের সাফল্য কামনা করি| পঠিত হোক| পাঠকের কাছে পৌঁছুক| লেখক আমাদের আরো সুন্দর সুন্দর লেখা উপহার দিক| তাঁর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা|

শিশির মল্লিক

কবি ও চিত্রশিল্পী

২১ জুন ২০২৬


Discover more from পথের দাবী

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

Popular

More like this
Related

শিল্প পরিক্রমায় শিল্পের সাম্পান: শিল্পীর প্রেম, ভালোবাসা, উপলব্ধির গভীরতা— আলোড়িত করতে পারে জনপদ

শিশির মল্লিক শিল্পদর্শন, শিল্পপাঠ কিংবা শিল্প আলোচনা/সমালোচনা— দর্শক, পাঠক, আলোচক...

গিওর্গি প্লেখানভ: মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ব্যাখাকার, প্রয়োগে পথভ্রষ্ট পথিক; তবুও মার্কসবাদের শিক্ষক হিসেবে সমুজ্জ্বল

গেওর্গি প্লেখানভ (জন্ম: ১১/১২/১৮৫৬-মৃত্যু: ৩০/৫/১৯১৮) রাশিয়ার মার্কসবাদী তত্ত্বিক, দার্শনিক, রাজনীতিক...

চিত্রশিল্পী মহিউদ্দিন আহমেদের শিল্প উপাখ্যান:প্রকৃতি-পরিবেশের ওপর সমাজ-সভ্যতার আগ্রাসন নিরোদের আহ্বান।

শিশির মল্লিক সমাজে শিল্পের ভূমিকা নিয়ে সমাজ-রাষ্ট্রের বোঝাপড়ার যথেষ্ট ঘাটতি...