শিশির মল্লিক

শিল্পদর্শন, শিল্পপাঠ কিংবা শিল্প আলোচনা/সমালোচনা— দর্শক, পাঠক, আলোচক বা সমালোচকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি বা উপলব্ধিকে রিপ্রেজেন্ট করে। ফলতঃ কোন সুনির্দিষ্ট ফ্রেমে শিল্প বা শিল্পীর মূল্যায়ন টানা কঠিন। একই কথা শিল্পের নন্দনতাত্ত্বিক বিষয়েও বলা যায়। এতৎসত্বেও শিল্প ও শিল্পীর মূল্যায়নের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ শিল্পী যা সৃষ্টি করেন তাই চরম বা পরম নয় মোটেই। শিল্পকে কোন সীমা রেখায় বাধা চলে না। শিল্প প্রাণ-প্রকৃতি ও সমাজের মতোই গতিশীল ও পরিবর্তনীয়। সমাজ বিকাশের সাথে সাথে মানুষের চৈতন্যের পরিবর্তনও ক্রমবিকাশমান।
এদিক থেকে পূর্ববর্তী শিল্প বা শিল্পীই চরম বা পরম থাকেন না। থাকেন না অনুকরণীয়। সেসব হয়ে ওঠে সময়ের প্রতিনিধিত্ব মাত্র। দেখা যায় সময়ের সাথে শিল্প সৃষ্টি ও শিল্পীর ব্যক্তিত্ব জোড়বাধা— তাকে ছেঁড়া বা বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তাই বলে অতীতের সৃষ্ট শিল্প বা শিল্পীকে বাদ নয়; বরং বর্তমানের শিল্প ও শিল্পীর যোগই ঘটে তাতে। শিল্প হয়ে ওঠে সভ্যতার ঐতিহ্য।
এ সত্য যতো সহজ করে বলা যায়; মানা যায় না মোটেই। কারণ মানুষ স্বভাবসুলভ ভাবে অতীতমুখীন অভিজ্ঞতায় জাড়িত এবং থাকেন অতীতের প্রতি ফেসিনেটেড। অতীতের যা কিছু সবই ভালো, বর্তমানে কি হচ্ছে! এসব ধাঁচের কথাবার্তা আমরা প্রায় শুনতে থাকি চারপাশে। তারপরও বর্তমানের সৃজনশীলরা তার কাজটি করে ইতিহাসের অংশ হয়ে যান নিজের অজান্তেই। আবার প্রতিষ্ঠা বা প্রচার পাওয়ারা অনেকেই আত্মম্ভরি হয়ে উঠেন প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের কারণেই। সময় কারো আনুকূল্যে থাকলে তার কাছে এমন মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক ঠেকে না। তৎসত্বেও ইতিহাস অত্যন্ত নির্মোহ। নতুন সময় এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অনেককেই খড়কুটোর মতো। নতুনরা জায়গা করে নেয় আপন কৃতিত্বেই।
আমাদের দেশের আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষায় শিক্ষিত শিল্পীদের সৃষ্ট শিল্পকলার ইতিহাস খুব বেশিদিনের নয়। ইংরেজ আমলে বাংলার প্রাণকেন্দ্র ছিলো কলকাতা। শিলপ-সংস্কৃতি-রাজনীতি-অর্থনীতির কেন্দ্র ছিলো এটিই। এই কেন্দ্রকে বিকেন্দ্রিক করার ইংরেজ কূটনীতি দ্বি-জাতিতত্ত্বের ধারণাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। যার ফলশ্রুতি দ্বিখণ্ডিত হয় বাংলা। কলকাতায় পাঠ নেওয়া শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, শিল্পী এস এম সুলতান, শিল্পী কামরুল হাসান, শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ, শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার, শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার মতো শিল্পীরা দেশভাগের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের ভাষা-সংস্কৃতির নেতৃত্বকারী প্রতিনিধিত্ব লাভ করেন। কিন্তু পাকিস্তানের উগ্র জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িক দোষে দুষ্টতার কারণে, আমাদের ভাষা-সংস্কৃতিকে বড় বাধা মনে করে। তার বিপরীতে তাদের ভাষা-সংস্কৃতির আগ্রাসন চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। ভ্রুণ সৃষ্টি হয় বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের চেতনার। শিল্প-সাহিত্যিকরা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এবং বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের শিকড় খুঁজতে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের শিল্পজগতের গৌরবময় ধারার সৃষ্টি হয়। শিল্পচার্য জয়নুল আবেদীনের সমাজ বাস্তবতাবাদী ধারার শিল্পচর্চা আমাদের দেশের সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও তাদের জীবনাচারের দৃশ্যাবলী হয়ে ওঠে মূল প্রতিপাদ্য। শিল্পী এস এম সুলতান কৃষিসমাজ ও কৃষককে করে তোলেন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের শক্তিমত্তার প্রতীক হিসেবে। শিল্পী কামরুল হাসান তুলে আনেন আমাদের লোক ঐতিহ্যের ধারা ও চর্চার শিকড়কে আধুনিক শিল্পের পাদপীঠে। শিল্পী শফিউদ্দিন আহমদের ক্যানভাসে উঠে আসে সেই প্রান্তিক মানুষেরই জীবন ও সংগ্রামের ঐতিহ্যিক দৃশ্যাবলী— ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদী ধারার নান্দনিক সৌকর্যে। শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার শিল্পকে দৃশ্যশিল্পে প্রয়োগের সুযোগকে কাজে লাগান। গড়ে তোলেন আমাদের জাতীয় দূরদর্শন সম্প্রচারের জাতীয় প্রতিনিধিত্বকারী অনুষ্ঠানমালা। শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া ননঅবজেক্টিভ ধারায় চর্চা করেন। শিল্পের নান্দনিক পাঠের গুরুত্বকে প্রতিনিধিত্ব শিল্পকে কেবল বাণী বা আদর্শ প্রচারের বিষয় না রেখে সৌন্দর্যবোধ বা উপলব্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন তিনি। তাদের চর্চা ও প্রচেষ্টায় ইসলামি প্রজাতন্ত্রী পাকিস্তানের জায়গায় প্রতিষ্ঠা পায় গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশের শিল্প ঐতিহ্য। তাঁদের কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে তাঁরা হয়ে উঠেছেন আমাদের গৌরব।
তাদের উত্তরসূরীরা আরো বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় রাঙিয়েছেন শিল্পের ক্যানভাস। বিগত চুয়ান্ন বছর যদি আমরা স্টাডি করি পাবো— সমাজ বাস্তবতাবাদী ধারা, মরমী ধারা, ননঅবজেক্টিভ ধারা, কিউবিক ধারা, পরাবাস্তবাদী ধারা, লোকজ ধারা উত্তরাধুনিকতাবাদী ধারার পপ আর্ট, ইন্সটলেশন আর্ট, ভিডিওগ্রাফি, কম্পিউটার প্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাল আর্ট প্রভৃতি। হালে আরো নতুন নতুন ধারণা পশ্চিম থেকে আমাদের শিল্পচর্চায় যুক্ত হয়ে পড়ছে। বিশ্বায়নের এ যুগে এটাই স্বাভাবিক। আর্থ-রাজনৈতিক হাওয়ার সাথে সংস্কৃতিও আমাদের আচ্ছন্ন করে চলেছে বলা যায়। পাশাপাশি আমরা কি কোন হাওয়া বয়ে দিতে পেরেছি? এ প্রশ্ন এসেই যায়। তার উত্তর খুঁজতে হবে বৈকি! তার জন্য আর্টক্রিটিক খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।
নয়া ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক বন্দিত্বের ভিতর শিল্প সংস্কৃতিও বন্দী— তা অস্বীকারের উপায় নেই। রাজনীতিতে যেমন সামন্তীয় মূল্যবোধ প্রগাঢ় অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো হলো কিছু মানুষের বাপের সম্পদ এ মনোভাবে প্রতিষ্ঠিত। অথচ তারা বলে গণতান্ত্রিক দল। যেখানে গণতন্ত্রের কিছুই চর্চা হয় না, লোক দেখানো ছাড়া। তাই দেখা যায় দলীয় প্রধানের স্তুতি করেই সদস্য বা সংশ্লিষ্টরা সুবিধাদি নেন, পদ-পদবী লাভ করেন। কেউই সমালোচনা বা গঠনমূলক কথা বলার সাহস করেন না; পদ-পদবী ও সুবিধা বঞ্চিত হবার ভয়ে। তেমনি শিল্প-সংস্কৃতির জায়গাতেও এই পিতৃতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব স্পষ্ট। এমন কোন সংগঠন পাওয়া যাবে না যেখানে প্রতিষ্ঠাতার দলীয় সম্পদ নয়। তাই এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, একজন আরেক জনের পিঠ চুলকে দেওয়ার সংস্কৃতি। নিজেরাই নিজেদের প্রশংসা আর স্তুতি করেই শিল্পে তাদের দায় সারেন। এও দেখা যায়, যার কাজের প্রশংসা করা সত্যি দরকার তার ব্যাপারে চেপে যান। সামন্তীয় গিল্ড মানসিকতা তো রয়েছেই— কে ঢাকার, কে চিটাগাংয়ের, কে রাজশাহী বা খুলনার এ বাছ-বিচার তো আছেই। গ্যালারিওয়ালারাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেয়। কাকে প্লেস দিবে, কাকে দিবে না— এ মানসিকতা সর্বত্রই।
মিডিয়া আরেক বিচিত্র চিরিয়া। তারা তাদের বিজনেস পারপাস ছাড়া কিছুই দেখে না। নামে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিকতার ক্যাপশন ব্যবহার করে, কাজে টু পাইস কামানোর ধান্ধায় এখন মিডিয়া বিজনেসের তীব্র প্রতিযোগিতা। তেলামাথায় তেল দেওয়া তাদের আদর্শ শুধু নয়, যেন নৈতিক দায়িত্ব। মিডিয়া কর্মীদের দেখা যায় সমাজে প্রতিষ্ঠিতদের প্লেস দেওয়া বা সংবাদ প্রচারে তাদের দারুণ খাটাখাটনি। সোশ্যাল মিডিয়া আপন ঢাক আপনি পিটানোর প্রচরানায় সয়লাভ। তাই শিল্প মূল্যায়ন দূরহ তো বটেই কে শিল্পী, কে শিল্পী নয়— এই পার্থক্য রেখা টানা দূরহ। অনেকে মনে করেন এর দরকারই বা কি? চলুক না যার যার মতো করে খেয়ে পড়ে বাঁচুক।

এই বিচিত্রতা আর প্রতিবন্ধকতার ভেতর একজন নবীন বা অপরিচিত শিল্পীর উত্থান বা প্রকাশ খুব সহজসাধ্য কাজ নয় মোটেই। পুঁজিবাদী সমাজে মধ্যবিত্ত বা পেশাজীবি নামের যে শ্রেণীটি তৈরি হয়েছে তারা মূলত বেইসলেস। তাদের উত্থানের চেয়ে পতনের সম্ভাবনায় বেশি। কেউ কেউ উপরে উঠেন তো পিছিয়ে পড়েন অনেকেই। তাই পতন ঠেকাতেই যতো মেধা ব্যয় করতে হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে। অথচ এখান থেকেই শিল্প-সাহিত্য রাজনীতি সংস্কৃতিতে যোগ দেয় একটি অংশ। আর্থিক অনিরাপত্তার লড়াইয়ে সবাই নিরাপদ করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কেউ কাউকে জায়গা ছাড়তে রাজি নয়। এখানেও সিন্ডিকেড শব্দটি শুনে আসছি বেশ সময় ধরে। অর্থনৈতিক অনৈতিকতা যুক্ত হয়ে পড়েছে এ সেক্টরেও— যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বাস্তবতায় বটে।
এই অচলায়তন ভাঙ্গার মতো সৃষ্টি ও সাহস কোন নবীন শিল্পীদের মধ্যে পুঞ্জিভূত না হলে, তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠবে না শিল্পের ঘরে ঠাঁই নেওয়ার। যদিও আমাদের দেশে বর্তমানে প্রচুর শিল্পী রয়েছে যারা নিভৃতে কাজ করে যায়। সামর্থ্য ও পৃষ্ঠপোষকতাহীনতার কারণে একটা ব্যয়বহুল প্রদর্শনী আয়োজন করতে পারে না। এদের মধ্যে বেশির ভাগ ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট। তেমনি একজনের শিল্পকর্ম নিয়েই আমি এখানে আলোকপাত করবো। তিনি হলেন শিল্পী গোলাম সারোয়ার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতোকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ঢাকায় আছেন দীর্ঘ সময় ধরে। বর্তমানে ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট। সন্তান ও পরিবার নিয়ে একটি লড়াই যেন তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তার ক্যানভাসের জগত অত্যন্ত আনন্দ উদ্দীপক। প্রতিকূলতার মধ্যে তিনি এতো আনন্দ কোত্থেকে পান, ভাবতেই তার প্রতি শ্রদ্ধা জাগবে যে কারুর।
আমি তাঁর ছবি কেবল দেখেছি নয়, পাঠ করেছি। মুগ্ধ হয়েছি। শিল্পী হিসেবে আরেকজন শিল্পীর অনুরাগী হয়ে ওঠা বা বিস্ময় জাগাতে পারা নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের। শিল্পী গোলাম সারোয়ার সত্যিই সেই কৃতিত্বের দাবীদার। ছবি আঁকার মাধ্যম, উপকরনে বাহুল্য নেই। বেশির ভাগ কাজ তার কাগজে কলমে, সেই সাথে জলরংয়ের কাজ। ক্যানভাসে এ্যাক্রিলিকেও তিনি স্বাচ্ছন্দ্য। তাঁর চিত্র রচনার সময়কালকে আপাত ৩টি ধাপে দেখতে পাই। ২০১৭ — ২০১৯ সাল পর্যন্ত জল রংয়ের কাগজের ওপর কম্পোজিশন ধর্মী কাজ। ২০২০ — ২০২৩ পর্যন্ত ক্যানভাসে এ্যাক্রিলিকে জলরংয়ের স্টাইলে বেশকিছু কাজ এবং ২০২৪-২০২৫ পর্যন্ত কাগজে কালি ও কলমের কাজ। ২০২৬ সাল থেকে তিনি ক্যানভাসে এ্যাক্রিলিকে কাজ করছেন।
জলরংয়ের কাজে সিনিয়র শিল্পীর কাজের অনেকটা প্রভাব লক্ষ্যণীয় । এধরণের কাজ আমরা দেশের খ্যাতিমান শিল্পী মনিরুল ইসলামকেই করে আসতে দেখেছি। তাঁর জ্যামিতিক অবজেক্টধর্মী বিষয় ও রংয়ের বিন্যাস এবং রেখার যে স্বাতন্ত্র্যিক বিচরণ দেখি তা আমাদের চোখে স্থায়ি জায়গা করে নিয়েছে বহু আগেই। অনেক ক্ষেত্রে তিনি জ্যামিতিক অবয়বকেও ভেঙ্গে ফেলায় নিরীক্ষার ছাপ রেখেছেন। তাই শিল্পী গোলাম সারোয়ারের কাজগুলো দেখতে দেখতে যে কারোই মনে পড়ে যাবে শিল্পী মনিরুল ইসলামের চিত্রকথন। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় তার মাঝেও তার স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান। এটি শিল্পী নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টায় চর্চিত কালই বলা চলে। বেশকিছু বাস্তবধর্মী কাজও আমরা এসময় দেখি। বিশেষ করে চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠার প্রাক্কালে কাপ্তাই পেপার মিল এলাকায় বসবাসের কারণে, সেখানকার প্রাকৃতিক নৈসর্গ তার স্মৃতি ও মননে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। তিনি তার শিল্পভাষায় সেই অনুভূতিকে তুলে ধরেছেন। যা বাস্তব দৃশ্যের চেয়ে অনেক বেশি নান্দনিক সৌন্দর্য নিয়ে দর্শককে আনন্দ দেবে, এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়।
২০২০ — ২০২৩ পর্যন্ত ক্যানভাসে এ্যাক্রিলিকে জলরংয়ের স্টাইলের কাজগুলো বেশ উপভোগ্য। এগুলোতে অবজেক্ট হিসেবে র্যাক্টেঙ্গেল শেপ, ডট, লাইন ও কালারের ওয়াশ এফেক্টের মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছেন। রংয়ের ক্ষেত্রে হলুদ, কমলা, নীল, কালোর প্রাধান্য লক্ষণীয়। সাদা জায়গা ছেড়ে কম্পোজিশনকে এমনভাবে নির্মাণ করেন তিনি, যা ক্যানভাসের মূল কেন্দ্রে দৃষ্টিকে আটকে দেয়। রংয়ের বৈপরিত্য সৃষ্টিতে তিনি বেশ সতর্ক। কোন রংকে প্রাধান্যে রেখে তার সাথে অন্য রংয়ের কন্ট্রাস্ট তৈরি করায় তার দক্ষতা ঈর্ষণীয়। তবে নমনীয় রংয়ের প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব সহজেই চোখে পড়ে। জলরংয়ের বৈশিষ্ট্যে একাজগুলো যে কারো ভালো লাগবে।

২০২৪-২০২৫ সালের বেশিরভাগ কাজই কালি কলমের। ’২৫ সালের কাজই বেশি। এ সময় তিনি প্রচুর কাজ করেছেন। এবং এই কাজগুলো মূলত কাগজে— কলমের ডটে করা। ডটের সাথে লাইন ও সলিড ব্ল্যাক কালারও ব্যবহার করেছেন তিনি। তাতে আলো-আঁধারি আবহ তৈরিতে বেশ সাবলীলতা তৈরি হয়েছে। এগুলো বেশ পরিশ্রমী কাজ। অনেক ধৈর্য ও অধ্যাবসায়ের দরকার এ কাজগুলোতে। কিছু কিছু কাজে আমরা ব্যাতিক্রমও দেখি। দেখি রংয়ের উপস্থিতি। ওয়াশ কিংবা সলিড লাল রংয়ের ব্যবহার। প্রচ্ছন্ন বা অনুজ্জ্বল রং তার এ কাজগুলোকে এতোটাই আকর্ষণীয় করেছে যে, তা লিখে বুঝানো যাবে না। দর্শক দেখেই কেবল এগুলোর স্বাদ নিতে পারবেন। পাবেন তৃপ্তি, চোখ ও মনের তৃপ্তি।
এই সিরিজ কাজগুলোর তিনি নাম রেখেছেন সাম্পান। নাম থেকেই বুঝতে পারছেন শিল্পী চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জলযান ছোট ছোট নৌকাকে চট্টগ্রামের ভাষায় যাকে সাম্পান বলে। এগুলোর বৈশিষ্ট্য ও আকার সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১০—১২ জন যাত্রি বহন করা যায় এসব সাম্পানে। চাক্তাই থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন দিকে কর্ণফূলির শাখা প্রশাখা বিস্তৃত খালের মধ্যদিয়ে এই সাম্পানগুলো মানুষ ও মালামাল বহন করে। বর্তমানে যান্ত্রিক মটরের প্রচলন হওয়ায় দিন দিন সাম্পান কমে আসছে। কিন্তু শিল্পীর দেখা সেই শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিময় এ যান— তাঁকে ডাক দেয়। তিনি সারা দেন ক্যানভাসে— সেই সাম্পানের সুন্দর উপস্থাপনে। সাম্পানকে এখানে একটি নান্দনিক ফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি। সাম্পানকে ভার্টিক্যাল থেকে হরায়জেন্টাল কিংবা পরপর সাজিয়ে, ছোট এবং বড়র সিমেট্রি নির্মাণ করে কম্পোজিশনকে প্রাণবান করে তুলেছেন। সাম্পান কোথাও কোথাও ফিগারেটিভ অবয়বও নিয়েছে। সাম্পান-১৪ যে ছবিটি দেখি তাতে মিডল থেকে একটু নিচে সাম্পানের একটি অবয়ব মূল অবজেক্ট হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই ত্রিভূজের একটি প্রতীকি অর্থ আছে যা পৌরুষতাকে নির্দেশ করে। তিনি কেন্দ্রে এই ত্রিভূজ চিহ্নকে ফোকাস করেছেন। আমরা ধরে নিতে পারি ঐতিহ্য একটি পৌরুশালী ব্যাপার। ছবি জুড়ে ছোট ছোট সাম্পানের উপস্থিতি আছে। মূল অবজেক্টের ওপর দিয়ে এই ত্রিভূজটি গেছে। ত্রিভূজটিকে অন্যান্য সাথে সমন্বয় করার জন্য তার মাঝে কোথাও কোথায় তলের সাথে কাছাকাছি রংয়ে নিয়ে গেছেন, কোথাও ছোট ছোট অবজেক্ট তার ওপর চড়িয়ে দিয়েছেন, ছোট সাম্পানের একটি অংশ চড়িয়ে দিয়ে ত্রিভূজের অস্তিত্ব ধরা-অধরা করে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। তার বাইরে উপরের দিকে অবজেক্টকে যেভাবে বিন্যস্ত করেছেন তার মধ্যে একটি পরিপ্রেক্ষিতের অনুভূতি ধরা দেয়। মনে হবে নৌকার ছইয়ের ভেতরের আবহ। তারমধ্যে নানা অবয়ব, ডট, সাদা ও কালো ও গ্রে রংয়ের সিমেট্রি এনে যে ছন্দ তিনি উপস্থাপন করেছেন, তা এক পরম তৃপ্তিই তৈরি করে। শিল্পের কলাকৌশল ও নান্দনিক পরিশীলনের দক্ষ উপস্থাপনে মুগ্ধতা ছড়ায়। ছবির নিচের অংশে একটা ভার্টিক্যাল আবহ পাওয়া যায়। স্তরে স্তরে সাজানো সাম্পান ও অবজেক্টের বিন্যাস, দুপাশে হালকা ডটে ছেড়ে দেওয়া অংশ কম্পোজিশনে দ্যোতনা সৃষ্টি করে। উপর ও নিচের দু’ধরণের অবজেক্টের উপস্থাপন সত্বেও কেন্দ্রের ত্রিভূজ ও মূল বড় অবজেক্ট সাম্পানের প্লেসমেন্ট উপর-নিচকে দারুণভাবে সমন্বয় করে। উপর থেকে মাঝে ও নিচের অংশে লাল রংয়ে তিনটি ডিরেকশন ধর্মী লাইন পুরো সাদা-কালোর বিন্যাসে কালোর প্রাধান্যকে কিছুটা ম্লান করে দেয়। হঠাৎ করে দৃষ্টিকে আঁটকে দেয় রক্তিম ব্যঞ্জনায়। শিল্পীর এই সচেতন হৃদম তৈরির দক্ষতা ভালো লাগার মতো।
সাম্পান সিরিজের প্রত্যেকটি কাজে শিল্পের ব্যাকরণিক বা আঙ্কিক হিসেব নিকেষের সচেতন প্রয়াস লক্ষ্যণীয়। কি রংয়ের পরিকল্পনায়, প্যাটার্ণ, অবজেক্ট, পরিপ্রেক্ষিত, নির্মাণ-বিনির্মাণ, সিমেট্রি-ডিসিমেট্রি হরাজেন্টাল-ভার্টিক্যাল অবজেক্ট, ডট ও লাইন। সলিড ও হালকা টোনাল স্পেসের উপস্থাপনের মাধ্যমে এক নান্দনিক খেলা-ই শিল্পী গোলাম সারোয়ার খেলেছেন আপন আনন্দে। সেই আনন্দ সবাইকে করে আপ্লুত যা মনকে নাচিয়ে দেয়— দেয় মুগ্ধতা। এ মুগদ্ধতা তার সৃষ্টির প্রতি যেমন, তেমনি তার প্রতিও করে তোলে সমান আগ্রহী।

শিল্পীর মনোস্তাত্ত্বিক ভাবনা স্পর্শ করার যেসব ক্লু আমরা তার কাজের মধ্যে দেখি; তারই সূত্র ধরে চেষ্টা করা যাক শিল্পী গোলাম সারোয়ারকে ধরার। শিল্পের ব্যাকরণিক নন্দিত উপস্থাপনাভূতির ভেতর দিয়ে তিনি যে আবেগ বা অনুভূতি সামনে এনেছেন তা আমাদের শ্রমজীবী মানুষের জীবন সংগ্রামেরই বাহন ‘সাম্পান’। এই সাম্পান আমাদের সভ্যতার এক ঐতিহ্যিক প্রতীক শুধু নয়— এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনবোধের অনুভূতিরও প্রতীক। সাম্পানে করে গন্তব্যে ফেরা, আপনজনের সান্নিধ্য পাওয়ার আকুতি, নায়রের হৃদয়আকুল করা কোন তরুণীর প্রীতিময় মুখ, ক্লান্ত পেশাজীবী মানুষ, মাঝির পরিবারের প্রতি মানবিক প্রেমময় দায়— সেই সাথে ভূ-প্রকৃতির ঐশ্বর্যময় সৃষ্টি কর্ণফুলীর নিরন্তর বয়ে চলা, দুপাশে ছড়িয়ে থাকা পাহাড়, সমতল, সবুজের ভেতর লুকানো গ্রামের মুখ— সবই ভেসে ওঠে। যে স্মৃতিময় নৈস্বর্গের ভেতর শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছেন শিল্পী গোলাম সারোয়ার। তার প্রতি প্রগাঢ় প্রেম এই সাম্পান। এটি শুধু ঐতিহ্যের প্রতীক নয়, এটি শিল্পীর প্রেমেরও প্রতীক। একটি জনগোষ্ঠীর জীবন-যাপনের, সুখ-দুঃখ, আনন্দময় জীবনের গল্পও বটে। তিনি তাঁর শিল্প রচনার মাধ্যমে এই মানবিক প্রেমের গল্পই বিধৃত করেছেন আমাদের জন্য।
সুন্দর কেবল প্রেমিকের মনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা অন্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়, অন্যকেও আচ্ছন্ন করার শক্তি রাখে। যে শিল্পীর অন্তরাত্মায় প্রেম থাকে, ভালোবাসা থাকে, থাকে উপলব্ধির গভীরতা; তিনিই কাঁপিয়ে দিতে পারেন একটি জনগোষ্ঠীকে। শিল্পী গোলাম সারোয়ার তেমনই শিল্পী। যার তুলি কলম ও রংয়ে রাঙিয়ে যাবে আমাদের মনন অনুভূতি। তিনি আমাদের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমাদের শিল্প ঐতিহ্য আরো সমৃদ্ধ হবে তার মাধ্যমে— এ প্রত্যাশা করাই যায়…।
লেখক: কবি ও চিত্রশিল্পী
৩ আগস্ট, ২০২৬
Discover more from পথের দাবী
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

