শাহেরীন আরাফাত

২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি কেবল একটি তারিখ হিসেবে চিহ্নিত হলেও, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও মানবাধিকারের প্রেক্ষাপটে এটি একটি দগদগে ক্ষত। পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে, শত শত মানুষ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে বিশ্বজিৎ দাস নামের চব্বিশ বছর বয়সী এক নিরীহ দর্জিকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
সেদিন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচি চলছিল। পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকা ছিল থমথমে। সকাল ৯টার দিকে আইনজীবীদের একটি মিছিল বের হলে ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা তখন বিরোধী পক্ষকে দমনের জন্য ধাওয়া করে। আতঙ্কিত পথচারীদের ভিড়ে বিশ্বজিৎ দাসও ছিলেন, যিনি পেটের তাগিদে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। বিশ্বজিৎ কোনো রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, ছিলেন শাঁখারীবাজারের ‘আমন্ত্রণ টেইলার্স’-এর একজন সাধারণ দর্জি। তবুও তাঁকে ধাওয়া করে একটি ক্লিনিকের দোতলা থেকে টেনে-হিঁচড়ে নিচে নামানো হয়। এরপর শুরু হয় সেই পৈশাচিক দৃশ্য, যা টেলিভিশনের পর্দায় দেখে শিউরে উঠেছিল পুরো বিশ্ব। বিশ্বজিৎকে ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে হত্যা করা হয়।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, রফিকুল ইসলাম শাকিল চাপাতি দিয়ে বিশ্বজিৎকে একের পর এক কোপ দিচ্ছেন। মাহফুজুর রহমান নাহিদ, এমদাদুল হকরা লাঠি ও রড দিয়ে তাকে পিটিয়ে মাটিতে মিশিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। রক্তাক্ত বিশ্বজিৎ বারবার হাতজোড় করে বলছিলেন, ‘আমি ছাত্রদল বা শিবির করি না, আমি হিন্দু, আমি দর্জি।… আমি মরে যাচ্ছি, আমাকে একটু জল দাও’—কেউ এগিয়ে আসেনি। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, অদূরেই রায়ট গিয়ার পরা পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল। তারা কোনো হস্তক্ষেপ করেনি।
বিচারিক প্রহসন
হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শাসকদলের নেতারা দাবি করেন, হামলাকারীরা ছাত্রলীগের কেউ নয়। কিন্তু মিডিয়ার চাপে পুলিশ তদন্ত করতে বাধ্য হয় এবং ২১ জন ছাত্রলীগ কর্মীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এক ঐতিহাসিক রায়ে ২১ আসামীর মধ্যে ৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। এই রায় জনমনে কিছুটা স্বস্তি এনেছিল। মনে হয়েছিল, হয়তো অপরাধীরা শাস্তি পাবে। কিন্তু ২০১৭ সালে উচ্চ আদালতের রায়ে চিত্র পাল্টে যায়। নিম্ন আদালতের রায় নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে মাত্র ২ জনের (রফিকুল ইসলাম শাকিল ও রাজন তালুকদার)। চার জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়। বিস্ময়করভাবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত চার আসামীকে খালাস দেওয়া হয়।
উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তদন্ত কর্মকর্তা ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের গাফিলতির কথা। রাষ্ট্রপক্ষ আগে থেকেই মামলার মেরুদণ্ড দুর্বল করে রেখেছিল, যাতে আসামীরা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। একে ‘পরিকল্পিত ব্যর্থতা’ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।
মূল ঘাতক রফিকুল ইসলাম শাকিল কারাগারে থাকলেও, আরেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী রাজন তালুকদার ঘটনার পর থেকেই পলাতক। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের অধিকাংশই পলাতক। মূলত, দলীয় ছত্রছায়ায় তারা দেশে অথবা দেশের বাইরে নিরাপদ জীবনযাপন করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষ তাদের খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করলেও তার কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি।
ফ্যাসিবাদের উত্থান
বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল একটি ‘টেস্ট কেস’। বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মারার মধ্য দিয়ে সমাজে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছিল—বিরোধীদের নির্মূল করতে যে কোনো পদ্ধতিই বৈধ। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি ২০১৩ সালের কথিত ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ থেকে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের ব্যক্তিদের টার্গেট করতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জনগণের ভাবাবেগ ব্যবহার করা হয়। ভিন্নমতের উপর সহিংস দমনের সম্মতি উৎপাদন, প্রশ্নবিদ্ধ বিচার আর রাষ্ট্র ও আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে যে ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার উত্থান ঘটে; তারই ধারাবাহিকতায় ঘটে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড। গণঅভ্যুত্থানের পরও রাষ্ট্রব্যবস্থা যেমন বদলায়নি; তেমনি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান ‘মব মেন্টালিটি’। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরে ফজলুল হক মুসলিম হলে সেখানকার কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে অসুস্থ তোফাজ্জল হোসেনকে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। এরপর একদল লোক মাজারে হামলা চালানোকে দায়িত্ব হিসেবে কাঁধে তুলে নেয়। এমনকি কবর থেকে মরদেহ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতাও ওই ফ্যাসিস্ট ‘মব মেন্টালিটি’র ধারাবাহিকতা।
‘অপরকরণ’ ও ট্যাগিং পলিটিক্স
বিশ্বজিৎ সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও তাকে ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে হত্যা করা হয়। এই ‘ট্যাগিং’ কালচার ফ্যাসিবাদের অন্যতম হাতিয়ার। যার মানে, ক্ষমতার বাইরে থাকা ভিন্নমতের মানুষদের অধিকার হরণ করা যেতে পারে। কাউকে একবার ‘জামায়াত-শিবির’ বা ‘রাজাকার’ তকমা দিতে পারলে তার ওপর চালানো যে কোনো নির্যাতনকে জায়েজ মনে করা হতো। এই আচরণ আজও বিদ্যমান। এখন অন্যরূপে, অন্য নামে তা হাজির হয়েছে। এখন ট্যাগ দেওয়া হয় ‘ধর্ম অবমাননা’র।
রক্তের দাগ শুকায়নি
বিশ্বজিৎ হত্যার বিচার যদি দৃষ্টান্তমূলক হতো, আসামীরা যদি রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে পার না পেত, তবে হয়তো ২০১৯ সালে বুয়েটের আবরার ফাহাদকে প্রাণ দিতে হতো না। আবরার হত্যাকাণ্ড ছিল বিশ্বজিৎ হত্যার বিচারহীনতার সরাসরি ফলাফল। দুটি ঘটনার প্যাটার্ন একই—ভিন্নমতের সন্দেহ, ট্যাগিং এবং নৃশংস নির্যাতন। রাষ্ট্র যখন অপরাধীদের ‘আমাদের লোক’ মনে করে সুরক্ষা দেয়, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
বিশ্বজিৎ দাসের সেই রক্তমাখা শার্টের ছবি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার বিবেকের দিকে তাকিয়ে থাকা এক চিরস্থায়ী প্রশ্নবোধক চিহ্ন। নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামীদের উচ্চ আদালতে খালাস পাওয়া বা দণ্ড কমে যাওয়া প্রমাণ করে যে, বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন!
২০২৫ সালের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা বাস্তবায়ন করতে হলে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলোর পুনঃতদন্ত ও পলাতক আসামীদের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের মানে কেবল সংবিধান বা আইনের পরিবর্তন নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো মায়ের সন্তানকে রাজপথে দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ দিতে হবে না এবং বিচারকের কলম কোনো অদৃশ্য শক্তির ইশারায় থেমে যাবে না। বিশ্বজিৎ হত্যার ঐতিহাসিক কলঙ্ক মোচন করেই সেপথে এগোতে হবে…
লেখক: কবি ও সাংবাদিক




