গিওর্গি প্লেখানভ: মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, প্রয়োগে পথভ্রষ্ট তবুও সমুজ্জ্বল

Date:

গেওর্গি প্লেখানভ: (জন্ম: ১১/১২/১৮৫৬-মৃত্যু: ৩০/৫/১৯১৮)

রাশিয়ার মার্কসবাদী তত্ত্বিক, দার্শনিক, রাজনীতিক ও সমাজচিন্তক। তাঁকে রাশিয়ায় ‘মার্কসবাদের জনক’ বলা হয়। শিল্প, সাহিত্য ও সমাজ ভাবনায় তিনি মার্কসবাদী দর্শনের আলোকে পর্যালোচনা বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ লিখেছেন প্রচুর। যা রাশিয়ায় মার্কসবাদ ও মার্কসবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চায় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। তিনি শুধুমাত্র তাত্ত্বিকই ছিলেন না। ছিলেন বিপ্লবী সংগঠনের কর্মী, সংগঠক ও নেতৃত্বও। যৌবনের শুরুতে ১৮৭৫-৭৬ সালের দিকে প্লেখানভ সেন্ট পিটার্সবার্গে খনি প্রকৌশলবিদ্যার ছাত্র থাকাকালীন ‘জমি ও স্বাধীনতা’ (Land and Freedom) বা রুশ ভাষায় ‘জেমলিয়া ই ভোলিয়া’ (Zemlya i Volya)  নামের সংগঠনে যোগ দেন। এটিই হচ্ছে পপুলিস্ট বা নারদনিক সংগঠন। দ্রুতই তিনি এর একজন প্রধান তাত্ত্বিক এবং বক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

এই সংগঠন বিশ্বাস করতো কৃষকরাই বিপ্লবের প্রধান শক্তি। তাই তারা গ্রামে চলে যেতো, কৃষকদের বুঝানোর চেষ্টা করতো, কিন্তু কৃষকরা তাদের সেভাবে সমর্থন করতো না। ব্যক্তি হত্যার মধ্যদিয়ে ক্ষমতা দখল করার উদ্দেশ্যে তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করতো। দ্বিতীয় জারকে হত্যা করার ফলে তাদের সংগঠন ম্যাচাকার হয়ে যায়। লেনিনের বড় ভাইও এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হয়। প্লেখানভ কৃষকদের  সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের বিরোধিতা করতে যেয়ে এখানে বেশিদিন টিকতে পারেন নি, বেরিয়ে আসেন ১৮৭৯ সালে। গ্রেপ্তার এড়াতে তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে হয়েছিলো জেনেভায়। এই জেনেভাতেই ১৮৮০ থেকে ১৯১৭ সাল প্রায় ৩৭ বৎসর পর্যন্ত কাটিয়েছিলেন। রুশ বিপ্লবের পর পর তিনি কিছুদিনের জন্য রাশিয়ায় আসেন এবং লেনিনের নেতৃত্বে ক্ষমতা দখলের বিরোধিতা করেন।

লেনিন প্লেখানভের ভূমিকাকে যেমন সম্মান করেছেন তেমনি রাজনৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্নে তাঁর সমালোচনাও করেছেন। কিন্তু সেসবই সম্মানজনক এবং তাত্ত্বিকভাবে খন্ডনের মাধ্যমে, ব্যক্তিগত আক্রমণের সাহায্যে নয়। তিনি শেষদিকে অক্টোবর বিপ্লবের প্রাককালে প্লেখানভের ভূমিকাকে “renegade” (পথভ্রষ্ট মার্কসবাদী) হিসেবে মন্তব্য করেন। এই বক্তব্যের মধ্যেই তার পূর্বের ভূমিকার স্বীকৃতি স্পষ্ট।

সহজ করে বললে দাঁড়ায় গিওর্গী প্লেখানভ মার্কসবাদকে কিছুটা যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছিলেন। তিনি মনে করতেন রাশিয়ায় পুঁজিবাদের পূর্ণ বিকাশের আগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অসম্ভব । তাই তিনি প্রথমে বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের গুরুত্ব তুলে ধরেন। অন্যদিকে প্রলেতারিয়েতকে বুর্জোয়ার সাথে জোট করার তাগিদ দেন। তা না করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের চেষ্টা হবে হঠকারি।

তিনি লেনিনের বিপ্লবী ও কেন্দ্রীভূত সাংগঠনিক চর্চার নীতিকে মানতে পারেন নি। মানতে পারেন নি প্রলেতারিয় একনায়কত্বের ধারণাকেও। ফলে মার্কসবাদী ধারণাকে বিপ্লবের মাধ্যমে প্রয়োগের বাস্তব ভূমিকায় তিনি বাতিল হয়ে যান। বলশেভিক বিপ্লবের বিরোধী মেনশেভিক ধারার প্রতিনিধিত্ব হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার শেষ করেন।

রুশ সমাজবিপ্লবের এক পুরোধা বুদ্ধিজীবী ও মার্কসবাদী দার্শনিক ও মার্কসবাদ প্রচারের মাধ্যমে একটি বিপ্লবী প্রজন্মকে দিক্ষীত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পরও তিনি চূড়ান্ত অর্থে বিপ্লব বিরোধি ভূমিকায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে যে রচনাটি তিনি লিখেছেন তাতে ব্যক্তি প্লেখানভের মূল্যায়ন কিভাবে হবে তার উত্তর পাবেন নিশ্চয়।

তাঁর রচিত বইসমূহ ও বইয়ের মূল তাত্ত্বিক ধারণা সহ নিচে উল্লেখ করছি-

  • Essays on the History of Materialism(1895)

প্লেখানভ এই রচনায় দেখিয়েছেন যে, মার্কস ও এঙ্গেলসের ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ কোনো আকাশ থেকে পড়া বিষয় নয়, বরং এটি ইউরোপীয় দর্শনের দীর্ঘ বস্তুবাদী ঐতিহ্যের একটি যৌক্তিক ও উন্নততর পরিণতি। তিনি প্রমাণ করেন যে, প্রাচীন বস্তুবাদের সীমাবদ্ধতাগুলো (যেমন যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি) কাটিয়ে মার্কসবাদ কীভাবে সমাজ ও ইতিহাসকে বোঝার পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান হয়ে উঠেছে।

  • Socialism and the Political Struggle (1883)

এটি রাশিয়ার বিপ্লবীদের সামনে এক নতুন দিশা উন্মোচন করে, যা পরবর্তীকালে লেনিন ও বলশেভিকদের জন্য তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। এই রচনার মাধ্যমেই প্লেখানভ প্রমাণ করেন যে মার্কসবাদ কেবল পশ্চিম ইউরোপের জন্য নয়, রাশিয়ার বাস্তবতায়ও এটি সমানভাবে কার্যকর।

  • Our Differences (1885): 

এটি ছিল নারোদনিকদের ‘কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের’ বিরুদ্ধে মার্কসবাদের ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’ বিজয় ঘোষণা। এটি রুশ বিপ্লবীদের আবেগ ছেড়ে বাস্তব অর্থনীতির ভিত্তিতে লড়াই করতে শিখিয়েছিল।

  • The Development of the Monist View of History (1995)

একে রুশ মার্কসবাদের ‘বাইবেল’ বলা হয়। এটি পড়ে লেনিনসহ এক বিশাল তরুণ প্রজন্ম মার্কসবাদে দীক্ষিত হন। এটি তৎকালীন রাশিয়ার ‘সাবজেক্টিভ’ বা ভাববাদী সমাজতাত্ত্বিকদের যুক্তি তছনছ করে দিয়েছিল। লেনিন বলেছিলেন, “এই বইটির মাধ্যমেই রাশিয়ায় মার্কসবাদ বিজয়ী হয়েছে।”

  • The Role of the Individual in History (1998)

ইতিহাস ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব নিয়ে এটি একটি ধ্রুপদী তাত্ত্বিক রচনা। প্লেখানভ দেখিয়েছেন যে মহাপুরুষরা ইতিহাস তৈরি করেন না, বরং ইতিহাসই মহাপুরুষদের তৈরি করে। তবে সেই মহাপুরুষরা যদি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তবে তারা ইতিহাসের গতিকে বেগবান করতে পারেন।

  •  Art and Social Life (1912)

এটি একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রবন্ধ, যা মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্বের (Marxist Aesthetics) অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। তিনি মনে করতেন, শিল্পীকে অবশ্যই তার সময়ের সামাজিক দ্বন্দ্বগুলো বুঝতে হবে। শিল্প কেবল বিনোদন নয়, বরং এটি মানুষের চেতনাকে উন্নত করার একটি মাধ্যম।

মার্কসবাদকে জানা বোঝার জন্য এই বইগুলো আজো গুরুত্বপূর্ণ ।


Discover more from পথের দাবী

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

Popular

More like this
Related

শিল্প পরিক্রমায় শিল্পের সাম্পান: শিল্পীর প্রেম, ভালোবাসা, উপলব্ধির গভীরতা— আলোড়িত করতে পারে জনপদ

শিশির মল্লিক শিল্পদর্শন, শিল্পপাঠ কিংবা শিল্প আলোচনা/সমালোচনা— দর্শক, পাঠক, আলোচক...

গিওর্গি প্লেখানভ: মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ব্যাখাকার, প্রয়োগে পথভ্রষ্ট পথিক; তবুও মার্কসবাদের শিক্ষক হিসেবে সমুজ্জ্বল

গেওর্গি প্লেখানভ (জন্ম: ১১/১২/১৮৫৬-মৃত্যু: ৩০/৫/১৯১৮) রাশিয়ার মার্কসবাদী তত্ত্বিক, দার্শনিক, রাজনীতিক...

চিত্রশিল্পী মহিউদ্দিন আহমেদের শিল্প উপাখ্যান:প্রকৃতি-পরিবেশের ওপর সমাজ-সভ্যতার আগ্রাসন নিরোদের আহ্বান।

শিশির মল্লিক সমাজে শিল্পের ভূমিকা নিয়ে সমাজ-রাষ্ট্রের বোঝাপড়ার যথেষ্ট ঘাটতি...