
বিজন সম্মানিত আশির দশক থেকে কবিতার সাথে তাঁর সখ্যতা। কবিতা চর্চার মধ্যদিয়ে তিনি প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। যুক্ত হন শ্রমিক রাজনীতিতেও। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ফেরেন। পেশাগত জীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চার সাথে নিজেকে পুনরায় যুক্ত করেন। অত্যন্ত রাজনীতি ও সমাজ সচেতন এই কবি প্রাণ-প্রকৃতি ও মানুষের সমাজকে দেখেন এক বিশেষ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে- যা মানুষের পৃথিবীতে সুসাম্যের সুষমায় উদ্ভাসিত করবে- এই প্রগাঢ় বিজ্ঞান মনস্ক চেতনায় কবি নির্মাণ করেন নতুন নতুন কবিতা…
নয়তো কেন বাঁচেবো!
ভিতরে পশুটা আছে বলেই বেঁচে আছি
পশুর লোভ থাকে,
আমিও লোভে লোভে থাকি
পশুর হিংস্রতা থাকে,
আমার হিংস্রতার নখ গুটিয়ে রাখি-
একদিন বের করবো ভেবে।
যারা ছিঁড়ে খায় ধানের সাদা ফুল,
তপ্ত বালু থেকে ছেঁকে আনা রেমিটেন্স
ছিঁড়ে খায় সেতারের সুর, রিজার্ভের সোনা
নগরের বহু উঁচু দিয়ে উড়ে যায় যে পাখি
তার ডানায়, ডানার পালক থেকে-
মেঘ ছিঁড়ে এনে যারা আঁকে ‘মুনাফা’
তাদের ইহকালের দিকে আমার লোভ।
একদিন আমি তাদের ইহকালের মধ্যে নখ বসিয়ে দেবো,
তাদের ইহকাল কাঁদতে কাঁদতে আমাকে ডাকবে ‘হায়েনা’।
না হয় কেন বাঁচবো!
এমন দেশে কি মানুষ বাঁচে!
বাঁচতে দেয়!
ফিলিস্তিনে যা বুনেছো
এই মাটিতে তুমি ভেবোনা গমের শীস বাতাসে দোল খাবে
সেখানে কোন গমের বীজ বোনা হয়নি।
বেইত লেহিয়াতের জমিগুলোতে ওয়াইন কালারের যে স্ট্রবেরি দেখছো,
সেগুলো একেবারেই মিথ্যা।
এখানেও কোন স্ট্রবেরি বীজ বোনা হয়নি।
দেইর আল-বালাহর রাস্তাগুলোতে যে গুচ্ছ গুচ্ছ ডেটসের ভাঁড়ার ঝুলে আছে
এমনকি খান ইউনুসের কমলা ও আঙ্গুরের বাগান থেকে যে মিষ্টি ঘ্রাণ পাচ্ছো
তাও সত্য নয়।
এই সব জমিতে কখনোই কোন খেজুর কমলা বা আংগুরের চারা রোপন করা হয়নি।
মানুষের তেরশো কোটি অসহায় চোখের সামনে,
মধ্য দুপুরে, পরিষ্কার বিকালে, জীবন্ত সন্ধায় এবং শব-ই-কদরের রাতে
প্যালেস্টাইনের প্রতিটি ধূলিকনার নীচে
তোমরা রোপন করেছো মানুষের ছিন্নভিন্ন শরীর-
ঘুমন্ত শিশুর শরীর, গর্ভধারিনী নারীর শরীর, গুলিবিদ্ধ যুবকের শরীর।
মাটিতে শিশুর শবদেহ বুনে রাখলে সেখানে কি ফুল ফুটে?
বালুতে ক্রুব্ধ বিদ্রোহ পুঁতে দিলে সেখানে কি আঙ্গুরের গাছ জন্মায়?
ভূমিতে ভূমিতে জায়নবাদ চাষ করলে কি সুসভ্য রাষ্ট্র জন্মে?
ইসরায়েল কোন রাস্ট্র নয়, প্রক্সি মাত্র
ইয়াংকীদের দাস মাত্র
জায়নবাদের ছায়া মাত্র
আমাদের গ্রহের এক আত্মগ্লানি ছাড়া কিছু নয়…
একদিন রোদে
একদিন রোদের ভেতর মচ্ছুপুচ্ছের চূড়ায়
সে চেয়েছিলো পিপীলিকা হতে-
ডানাওয়ালা পিপীলিকা।
শীতে ও ইতর বৃষ্টিতে আঁচলে চাবির বদলে
একটা ঘোর বেঁধে ঘুরেছে সে বারান্দায় বারান্দায় ।
বহুযুগ আগের গুপ্তধনের গুহায়-
শ্যাওলার নীচে, অহংকারের নীচে।
অন্তর্হিত হয়েছে সে ম্যামথদের যুগে
অতঃপর তাম্রলিপিতে।
কত ডেকেছি তাকে হুয়াংহু ও ভলগার পারে-
ফারাওদের সমাধিতে,
নেড়েচেড়ে দিয়েছি সোনা ও রূপার কাঠি-
ফেরেনি সে ।
মচ্ছুপুচ্ছের চূড়ায় আরো একদিন দাঁড়ায় সে প্রতিবিম্ব হয়ে
গৈরিক না রক্তিম, ধুসর না রক্তিম-
খুঁজি আমি সেই অস্থির অবয়ব ।
চেনার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে থাকে অচেনা
অচেনার মধ্যে ছোপ ছোপ চেনাগুলো
বৈকালিক আলোয় প্রলম্বিত হয়ে যায়
ছুঁতে পারিনা তাকে,
ছুঁতে পারি না তার দীর্ঘায়িত দেহ।
কত ডাকি- সে নেমে যায়, সে নেমে যায় পুবে
একসময় যেখানে আমরা আটটার সূর্য দেখতাম
সে নেমে যায় বুড়ো কনফুসিয়াসের পাঠশালায়।
সংশয়ী
জীবন
তাকে কখনো পরিযায়ী পাখির সাথে তুলনা করিনা
এমনকি মেঘ গলে রাত্রির কবিতা হতে এসেছিল যে ঘোরগ্রন্থ
তার সাথেও না।
এখন কেবলই পতনের দিন।
পতনের চাতুর্যে আঁকি হাততালি ভরা হলঘর,
কাঁধে ঝুলানো ভায়োলিনে ভরে রাখি-
মৃত গাভীর সামনে কেঁদে যাওয়া কিষাণী।
মুমুর্ষ রাতের জরায়ুতে জন্ম নেয়া মাটির পাওয়ালা দানব
গিলে ফেলছে সব শস্য, মাটির উষ্ণতা থেকে বেরিয়ে আসা হাসিমুখ-
আমাদের সফেদ স্বপ্নের মেঘ।
যা অবশিষ্ট থাকে তার সামনে দাঁড়াই,
প্রার্থনা করি একজীবন গার্হস্থ্য স্বাদ- সুবাসিত চুলের শরীর।
কোন এক বহুগামি চিবুকে সমর্পণ করি-
নিজের বহুগামী মনোরোগের অন্ধ পরিতৃপ্তি।
সব অন্ধরা একসাথে আছি- এমন নয়
কেঁচো কৃমি কীট এক সাথে আছি- এমনও নয়।
তবু মানুষের নামে নিজের মধ্যে ঝুলে আছে যে
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এক খণ্ডিত মানুষ
সংশয়ী মানুষ!
অবশিষ্ট ভালোবাসা
আমি ভালোবাসি মানবি তোমার মধ্যে উন্মাদ গন্ধ-
কতো কতো ট্রেনে ভরা রাত,
মধ্যঘরে অন্ধকারে সুখি কুকুরের মতো কাটানো রাত
তুমি আমি নিজস্ব শৈলীতে,নিজেদের দাবিকৃত সম্পত্তির গলি ঘুপচিতে
সভ্য বয়নে শুয়ে থাকা আমাদের মানুষী শরীরের মধ্যাহ্ন ।
আমাদের সুখী দিন- মনে আছে ?
এখন কেটে নেয়া ধান গাছের ভুরভুরে পচা গন্ধে ,অমাবশ্যায়,
স্বর্গের বেশ্যাদের চোখে ওম গুঁজে,
আত্মমৈথুনে অভ্যস্থ লুলা শব্দাবলী থেকে তোমাকে বলবো, ‘ভালোবাসি’!
এরচে’ আমার আয়ুষ্কালকে দৈনিকে টুকরো করে খেয়ে ফেলে যে দানব
তাকেও ‘ভালোবাসি’ বলবো একদিন।
যে খায় আমাদের প্রতিটি দিন
তুলে নেয় উৎপাদনের অংশটুকু
সংবিধানের সুরঙ্গে, রাষ্ট্রের প্রহরায়।
তোমাকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করে যে জটরের বিকার,
বেচে দেয় মুনাফার দাসে, সুর্যহীন ঘুলঘুলিতে, হাহাকারে, একাকী,
মানুষের ঘ্রাণহীন নৈশব্দে।
আমি কি তোমাকে ভালোবাসিনি আশি হাজার বছর লাল বরফ-
যখন পৃথিবীকে ঢেকে রাখলো,
যখন প্যানজিয়া ভেংগে গেলো,
যখন কাই-কুঁই করা ভাষাহীন গুহাবাসি আমরা,
যখন তুমি জমিন তৈরি করছো, আমি শিকারে- মুক্ত মানুষ ?
তারপর কে আমাদেরকে সম্পত্তির কারাগারে কারাগারে বিচ্ছিন্ন করেছে ?
কে তোমাকে বেচে দিলো, আর আমাকেও?
কে বেচে দিলো ঘোড়াগুলোর সাথে বাজারে বাজারে,
গম ও জিন্সের সাথে বাজারে বাজারে?
রাজনীতি ও ঈশ্বরের সাথে ইতিহাসের বাজারে বাজারে,
কারা বেচে দিলো আমাদের দেহকে, আমাদের ভালোবাসা সমেত !
সাক্ষী থেকো…
