Will the Awami League be able to bounce back?

সাইফুর রহমান তপন
সংগ্রহ সমকাল
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত প্রথম মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-আইসিটি। প্রত্যাশিতভাবেই এ রায় নিয়ে বিশেষত নিহতদের পরিবার, আহতসহ অন্য আন্দোলনকারীদের মধ্যে সন্তোষ দেখা গেছে। একই সঙ্গে এই প্রশ্নও উঠেছে, এ রায় আওয়ামী লীগের ওপর কী প্রভাব ফেলবে?
আলোচনাটা এ কারণেও গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রচলিত আদালত ও আইসিটিতে গত বছরের ৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পাঁচ শতাধিক মামলা হয়েছে; অধিকাংশই খুনের মামলা। অনিবার্যভাবেই, আগামীতে আরও রায় আসবে, যা শেখ হাসিনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যাবে। উপরন্তু আইসিটিতে খোদ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই তদন্ত শুরু হয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় দলটি স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। মোট কথা, অদূর ভবিষ্যতে অন্তত আইনগতভাবে গত প্রায় ১৬ বছর দাপটের সঙ্গে দেশ শাসনকারী দলটি আরও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে পারে।
বেলজিয়ামভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপও (আইসিজি) এক বিবৃতিতে বলেছে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ। কিন্তু যতদিন তিনি আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাবেন, ততদিন দলটির জন্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ফেরার পথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম (সমকাল, ১৮ নভেম্বর ২০২৫)।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক বাণী এর আগেও এসেছে। বিশেষত গণঅভ্যুত্থানে দলটির নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর দলের প্রধানসহ বেশির ভাগ নেতা জেলে বা দেশে-বিদেশে আত্মগোপনে গেলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই খুব জোর দিয়ে বলেছেন, রাজনীতিতে আওয়ামী লিগের ফিরে আসা অসম্ভব। দলটি মুসলিম লীগের ভাগ্য বরণ করেছে– প্রয়াত বামপন্থি তাত্ত্বিক ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর বলেছিলেন। এমনকি কেউ কেউ এমনও বলেছেন, এত বড় গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ফিরে এলে খোদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানই মিথ্যা হয়ে যাবে। সোমবারের রায়ের পর এ ধরনের চিন্তা আরও পোক্ত হবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।
| আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়ানো রাজনৈতিক সংকট সংগঠনের পুনর্গঠন নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ ভোটের রাজনীতি জনসমর্থন রাজনৈতিক বাস্তবতা জনআস্থা পুনর্গঠন দলীয় সংস্কার নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা নির্বাচনী কৌশল রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা জনপ্রিয়তা পুনর্গঠন | সরকারবিরোধী চাপ সাংগঠনিক দুর্বলতা রাজনৈতিক পুনরুত্থান মাঠ পর্যায়ের রাজনীতি ভবিষ্যৎ কৌশল ইমেজ ক্রাইসিস রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস নীতিগত পরিবর্তন নির্বাচনী কৌশল রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা জনপ্রিয়তা পুনর্গঠন গণআন্দোলনের চাপ দলীয় বিভক্তি নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস | রাজনৈতিক পুনর্গঠন সংকট উত্তরণ দলীয় ঐক্য ক্ষমতা পুনরুদ্ধার জনমত পরিবর্তন নেতৃত্বের পুনঃমূল্যায়ন সংগঠন শক্তিশালীকরণ নীতিগত পুনঃব্যবস্থা কৌশলগত রোডম্যাপ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা জবাবদিহির অভাব তৃণমূলের অসন্তোষ দলীয় বিভক্তি নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস গণআন্দোলনের চাপ |
আরেকটা বিষয়ও এ গোষ্ঠীর চিন্তার পালে হাওয়া দিয়েছে। তা হলো, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘিরে আওয়ামী লীগের হাঁকডাকের প্রায় অসারতা। বিশেষ করে ১৩ নভেম্বর মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণের দিন আওয়ামী লীগ ঢাকায় ‘লকডাউন’ কর্মসূচি দিয়েছিল। একদিকে আওয়ামী লীগের তৎপরতা, আরেকদিকে সরকারের অস্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে কর্মসূচিটি ভালোই সাড়া পায়। কিন্তু ১৭ নভেম্বর; যেদিন মামলার রায় ঘোষণা হলো, আওয়ামী লীগ সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি দিলেও জনজীবনে তার প্রভাব সামান্যই ছিল। দলটির নেতাকর্মীদের সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ঝটিকা মিছিল করতে দেখা গেলেও রায় ঘোষণার দিন এর কিছুই দেখা যায়নি। গোপালগঞ্জ, ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও শরীয়তপুর-মাদারীপুরের কিছু অংশে এক ধরনের জনসমাগম ও বিক্ষোভ দেখা গেলেও ঢাকাসহ দেশে তাদের প্রভাব ও তৎপরতা ছিল খুবই ক্ষীণ। এতে এ ধারণা ভিত্তি পায় যে, আওয়ামী লীগ মানেই আন্দোলনের দল– এ মিথ সম্ভবত ভেঙে পড়েছে। বস্তুত দলটি এখন ‘খোঁড়া হাঁস’।
এমন ধারণা যে অমূলক নয়, বিগত টানা তিন মেয়াদে দলটির শাসনামল পর্যালোচনা করলেও পরিষ্কার হয়ে যায়। ২০০৯ সালে দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক সংখ্যকের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলো আওয়ামী লীগ। কিন্তু পাঁচ বছরের মধ্যেই নানা কারণে অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে দলটি। তখন দলটি ধাপে ধাপে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। তার অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে সরকারের মধ্যে যেমন প্রভাব বিস্তার করে এক ধরনের অলিগার্কি, তেমনি দলেরও নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সুবিধাবাদী চক্রের হাতে, দলটির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত তৃণমূলের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক ছিল না। এ অবস্থায় সরকারের পাশাপাশি দলের কাঠামো ভেঙে পড়া ছিল অনিবার্য। ৫ আগস্ট সেটাই ঘটেছে। ওই পরিত্যক্ত কাঠামো নিয়ে আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল না মিলারই কথা।
তবে এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের একটি বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের অবকাশ কম। তিনি বলেছেন, ‘যদি রায়ের মধ্যে কোনো ফাঁকফোকর থেকে থাকে, তাহলে যা হবে তা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোতে দূরত্ব তৈরি করবে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও অ্যান্টি আওয়ামী লীগ– এই রাজনীতিটা আরও নিষ্ঠুরতার দিকে যাবে’ (বিবিসি বাংলা, ১৮ নভেম্বর ২০২৫)। তার মানে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রশ্নে আওয়ামীবিরোধীদের নেতিবাচক তৎপরতাও আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে।
রাজনীতিতে যে কোনো ঘটনাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ বহুমাত্রিক প্রভাব নিয়ে ঘটে থাকে। ৫ আগস্টের ঘটনাও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। অস্বীকার করা যাবে না, শাসন কাঠামো থেকে স্বৈরতন্ত্রের বীজ উপড়ে ফেলার পাশাপাশি এর অন্যতম অঙ্গীকার ছিল বিগত কয়েক দশক ধরে বিরাজমান সাংঘর্ষিক রাজনীতির অবসান। এখানে বাম-ডান-মধ্যপন্থিসহ সব ধারার দলকে নিয়ে একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হবে– এটা শুধু আন্দোলনের নেতৃত্ব নয়; তাদের সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারও শুরুর দিকে বারবার বলেছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলো, সরকার ও রাজনীতির ভারকেন্দ্র ক্রমেই সরে গেল ডান থেকে চরম ডানের দিকে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে পড়ল আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু। এর অনিবার্য প্রতিক্রিযায় এ রাষ্ট্রের জন্মযুদ্ধখ্যাত মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে জনভাবাবেগ আবারও জেগে উঠল, যথাযথ বিকল্পের অনুপস্থিতিতে যার ফসল প্রায় পুরোটাই চলে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের ঘরে।
মনে রাখত হবে, মুক্তিযুদ্ধ শুধু এ রাষ্ট্রের জন্ম দেয়নি, এ জাতিরও নতুন পরিচয় তৈরি করেছে, যাকে অস্বীকার করে যে কোনো রাজনীতিই এখানে অচল। উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধের মূল ভাবাবেগ ধারণ করে যতদিন এখানে বিকল্প কোনো দল গড়ে না উঠবে, ততদিন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লিগের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ীই থাকে। পাকিস্তানবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের পরিণতিতে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পুষ্ট দলটির তৃণমূলও তাই জেগে উঠছে।
নিঃসন্দেহে, তৃণমূল জাগা মানেই আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান নয়। তবে তা দলটির ফিরে আসার ইঙ্গিত বহন করে– এটা মানতে হবে। দলটির যে ব্যর্থতা দেখে এর বিরোধীপক্ষ আত্মপ্রসাদ লাভ করছে, তার দায় মূলত আওয়ামী লীগের স্বীয় কর্মদোষে জনবিচ্ছিন্ন নেতৃত্বের, যাদের সঙ্গে তৃণমূলের পুনঃসংযোগ এখনও ঘটেনি। এ তৃণমূলের কারণেই আওয়ামী লীগ অতীতে অনুরূপ বিপর্যয়ের পরও ফিরে এসেছে। এখনও যে রাজনীতি আওয়ামী লীগ বনাম অ্যন্টি আওয়ামী লীগ চক্রে ঘুরছে, তারও কারণ দলটির শিলাসদৃশ সংহত তৃণমূলের তৎপরতা। আজকে যারা ঝটিকা মিছিল করছে, তারাই তৃণমূল। এমনও হতে পারে, এ ধারা চলতে চলতেই অন্তত মাঠ পর্যায়ে দলটির নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠবে, যারা আবারও রাজনীতিতে তাদের কর্তাসত্তা প্রতিষ্ঠা করবে।






interesting