উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

রাজনৈতিক চাহিদা থাকলে অবৈধ আয় বন্ধ হবে না…।
“ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অশুভ লেনদেন কিংবা আঁতাতের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে শুধু প্রশাসনিক সংস্কার দিয়ে সমাধান হবে না। অবৈধ আয়ের রাজনৈতিক চাহিদা যদি থাকে, তাহলে শুধু বিধিবিধান দিয়ে তার পথ বন্ধ করা যাবে না। একটি উৎস বন্ধ করলে আরেকটি উৎস চালু হবে। অতীতে তাই দেখা গেছে।”
গত ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক উন্নয়ন সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে মূল প্রবন্ধে এমন মত দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি আরো বলেন—“জুলাই পরবর্তী অবস্থায় অন্তত তিনটি বিষয় খুব প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, কার্যকর গণপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ। দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। সর্বশেষ হলো, উন্নয়নের গুণগত মান বাড়ানো অর্থাৎ যে উন্নয়ন ন্যায্য এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে সহায়ক হবে।”
রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এ উপলব্ধি আমাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করে তা বলাই বাহুল্য। আবার তাঁর মতো ব্যক্তিত্বরা যেহেতু সরাসরি কোন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি নন বা সাংগঠনিক কোন ক্ষমতা হোল্ড করেন না ফলে তাঁর মতামত রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে কতোটা গুরুত্ব পাবে সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। বরং আমরা ধরে নিতে পারি এটি তাঁর উপলব্ধি বা মতামত কিংবা প্রস্তাবনা ঐ পর্যন্তই।
অতএব প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, যারা বাস্তবায়ন করবেন তারা কারা? অবশ্যই জনপ্রতিনিধিত্বমূলক রাজনৈতিক দলসমূহ। সেই দলগুলোকে আমরা চিনি। যারা স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে চুয়ান্ন বছর এদেশ শাসন করেছে। প্রধানত সেই আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। অংশীদারিত্বে বিএনপির সহচর হিসেবে ছিলেন জামায়াতে ইসলামি।
এই দলগুলোর যারা প্রতিনিধিত্ব করেন তারা কারা? তাদের শ্রেণী চরিত্র কি? তারা কি ক্ষমতায় আরোহন করার জন্য জনগণের ওপর ডিপেন্ড করেন? নাকি ক্ষমতার জন্য বিশ্ব মোড়লদের ওপর ডিপেন্ড করেন? এরকম প্রশ্ন আসাটা খুবই স্বাভাবিক যে, আমরা দেখেছি স্বাধীনতা অর্জনের জন্যও আমরা বহির্শক্তির দ্বারস্থ ছিলাম। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতার ওপর আমাদের তখন ডিপেন্ড করতে হয়েছিলো। সেই নির্ভরতা থেকে বের হতে আরেক দল আবার আমেরিকার ওপর ডিপেন্ড করেছে। আমরা দেখেছি আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যেগুলো মূলত বিদেশী শাসকদের সরাসরি উপনিবেশ ছিলো তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতা লাভ করলেও অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে উঠতে পারেনি। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো ক্ষমতা ছেড়েছেই তাদের প্রতি আনুগত্যশীল প্রতিনিধিদের কাছেই। তাদের প্রতি অনুগত নয় বরং পুরোপুরি তাদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করা জাতীয়তাবাদী, বামপন্থী তথা সমাজতন্ত্রীদের ওপর চালিয়েছে ব্যাপক দমন পীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ। তার বহু উদাহরণ রয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশগুলোতে। ষাট সত্তর আশির দশকব্যাপি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের জোয়ার ছিলো তখন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো প্রধান নির্ভরতায়ই ছিলো তাদের অনুগত শাসক শ্রেণী ও আমলাতন্ত্র বিশেষত রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। ফলে সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখল ও রাজনৈতিক দল তৈরীর ইতিহাস আমরা দেখতে পাই।
নব্বইয়ের পরবর্তী সময়ে এই পলিসি কিছুটা পরিবর্তন আমরা দেখছি, সরাসরি সেনাশাসনের পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলো যারা সাম্রজ্যবাদী বিশ্বায়নের আর্থিক পরিকল্পনাকে স্বীকার করে নেবে এবং মান্য করবে তাদের দিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রহসন করা। বিগত পয়ত্রিশ বছরে সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে আমরা আমাদের দেশের দিকে যদি তাকাই কি দেখতে পাই? আমরা দেখেছি গণতন্ত্রের ন্যুনতম মূল্যবোধ বা চর্চা আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো করতে সম্পূর্ণত ব্যর্থ হয়েছে। এবং জনগণ বিশেষত কৃষক, শ্রমিক ও পেশাজীবী মানুষের মৌলিক অধিকার, সম্মান ও নিরাপত্তার অর্জিত হয়নি। উল্টো এই রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় একটি শ্রেণী বিকশিত হয়েছে সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে। রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি সর্বত্রই রাজনীতিক আধিপত্য এবং এই কাঠামোগুলো পুরোপুরি রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত। দলবাজি এমন একটি পর্যায়ে গেছে যে, সেখানে জনগণের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষিত। সমস্ত সেবাখাতগুলো এখন মনোপলি বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন ও রাজনীতির ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজি বৈধতা পেয়ে গেছে। এই চাঁদাবাজিকে জনগণ মেনেও নিয়েছে যেন। একদল গেলে আরেক দল আসবে তাদেরকে চাঁদা দিতে হবে এবং দিচ্ছেও। তাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হবার পর পর মাঠঘাট জলা জমি দখল হাটবাজার দখলে ব্যপৃত হয়েছে বিএনপি। নিজেদের মধ্যে খুনোখুনিতে বহুজন এর মধ্যে নিহতও হয়েছে। এই দখলদারিত্ব পুরোনোই; যা দেখে জনগণ বুঝে গেছে বিএনপি এলেও তাদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবে না। তবে শাসক শ্রেণী ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঠোকাঠুকি তা সাময়িক কমবে।
জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণ আওয়ামী লীগকে হঠানোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আন্দোলনের সাফল্যের পুরোটায় এখন বিএনপি জামাত পকেটস্থ করেছে। জামায়াতে ইসলামী এবার বেশ ফোকাসড হতে আমরা দেখলাম। জুলাই আন্দোলনের ক্রেডিটটা যেন তাদের। তাদের ছাত্রসংগঠন শিবিরই যেন তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বকারী সংস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচনের ফলাফলে তারা আরো বেশি কনফিডেন্ট। শিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রশাসনে তাদের ক্ষমতা দখলের সাফল্যে তারাও বেশ আশাবাদী এবার ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়ে। জনগণও কিছুটা দ্বিধান্বিত এই জন্যে যে, বিদেশী রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা জামায়াতের কাছে গিয়ে সাক্ষাত করছেন, বিদেশী এই দূতিয়ালীগিরি জনগণের মাঝে কৌতুহল তৈরি করে বৈকি! তাদের শরীকরা আরো বেশি আশাবাদী ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে ইসলামের। যেন তারা ইসলামের সালতানাত প্রতিষ্ঠা করে ফেলবে এই বাংলাদেশে!
কিন্তু যাঁর কথা দিয়ে আমরা এই লেখাটি শুরু করেছি সেই মাননীয় উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ যে মতামত রেখেছেন— “কার্যকর গণপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ। দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। সর্বশেষ হলো, উন্নয়নের গুণগত মান বাড়ানো অর্থাৎ যে উন্নয়ন ন্যায্য এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে সহায়ক হবে।” কোন রাজনৈতিক দল কি এ বিষয়ে জনগণের কাছে তাদের কর্মসূচি পেশ করেছে? অঙ্গিকার করেছে ক্ষমতায় গেলে তারা এটিই করবে?
অথবা আমরা কি এনসিপি বা বামধারার কোন রাজনৈতিক দল থেকে এ বিষয়ে অঙ্গিকার দেখতে পাচ্ছি?
আমাদের চাওয়া মাননীয় অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতামতটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে এ অর্জন খুবই প্রাসঙ্গিক। সেটার জন্যই জনগণ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে এ বিষয়ে তাদের কর্মসূচি কি সেই জবাবদিহিতা চালিয়ে যাক …
রাজনীতি ও রাজনীতিবিদরা জনগণের আকাঙ্খাকে প্রতিনিধিত্ব করে মাত্র, এ আদর্শে উজ্জীবিত হোক আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।





