সুকান্ত সেন গুপ্তের গুচ্ছ কবিতা

Date:

সুকান্ত সেন গুপ্ত চিত্রশিল্পী ও কবি। জন্ম চট্টগ্রাম কর্ণফুলি নদীর কূলে শিকলবাহা এলাকায়। আশির দশকের শুরুর দিকে চট্টগ্রাম চারুকলায় পাঠকালীন সময় লেখালেখি, সঙ্গীত, লিটলম্যাগ চর্চা, গ্রুপ থিয়েটার চর্চার মধ্যদিয়ে সৃজনশীল জগতে প্রবেশ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ শেষে পেশাগত জীবন, পারিবারিক, সামাজিক জীবন-যাপনের দ্বৈরথে শিল্পসত্তা ক্রমশ বিকশিত হয়েছে বলা চলে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। পাশাপাশি সৃজনশীল চর্চায়ও ব্যাপৃত আছেন তিনি…
এখানে তাঁর পাঁচটি কবিতা নিবেদন করলাম পাঠকদের জন্য।


১.
এখনও আছে

ওই টুকু আসতে দাও

যেটুকু গেছে যাক

যারা পালিয়েছে ওরা দেখেনি প্রজাপতির উড়াউড়ি

তোমার শাড়ির আঁচলে স্বচ্ছনীলের ভাঁজে-

ধব ধবে সাদা মেঘ,

স্বপ্নের ফড়িংগুলো উড়ে যায় আকাশ ছুঁবে বলে

ওরা কিছুই দেখেনি, কিছুই শুনেনি।

মাঝরাতে শিশিরের মৃদু শব্দ বাতাসে পাতার আলাপ

অজস্র ঘুমহীন রাত গেছে

ওরা সব সঙ্গী ছিল তোমার

প্রজাপতি ফড়িং জোনাকী শিশির-

বাতাসে আলাপরত গাছেদের পাতা।

বন্ধুত্বের আড়ি করে বিদায় নিতে চেয়েছিলে তুমি-

যেটুকু আততায়ী সময় গেছে যাক

যেটুকু সুসময় তাকে আসতে দাও

এখনও বিছায়ে আছে স্বচ্ছনীল অনন্ত আকাশ

উড়ে যায় ধবধবে সাদা মেঘ-

উড়ে যতো ইচ্ছের ঘুড়ি, ঘাস ফড়িং এর দল,

এখনও আছে কৃষ্ণচূড়ার বন।

যারা যেতে চাই যাক-

আমার আছে অনন্ত আকাশ।

২.
ছায়া শরীর

পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে মহাশূণ্যের স্বর শুনতে চেয়েছিলাম

নিষিদ্ধের কাঁটা জালে আবদ্ধ ছিলো পাহাড়

দূর্ভেদ্যের ঘাসে ঘাসে বিছানো ছিলো- মায়ার ফাঁদ

কিন্তু দূর্লঙ্ঘ্য ছিলোনা চূড়ায় আরোহন-

বিজয়ের অন্তরালে ছিলো অনন্ত আকাশ

আর আকাশ সমুদ্রের সীমাহীন আনন্দের ঢেউ।

কিছুই হলোনা-

শুধু নির্দিষ্ট সীমারেখার তীর যায় ক্ষয়ে,

ইচ্ছাগুলো বিলিন হয় অনন্তের শরীরে।

মনে হয়, কখনো কি ছিলাম-

এই আকাশ পাহাড় নদীমাতৃক দেশে!

নাকি এ নামগুলোই আমার সত্তার প্রপঞ্চ!

জিজ্ঞাসার প্রাবল্যে বহেমিয়ান সময়

সুস্থির আদৌ কি আছি আমি?

৩.

সুবিনয়ের চিঠি

সুবিনয়,

কেমন আছিস?

কাল তোর মন খারাপের চিঠি পেলাম

যেতে যেতে কতদূর গেলে অদৃশ্য হওয়া বলে-

তোর ঢের জানা আছে নিশ্চয়।

লক্ষ তারার ভিড়ে অস্তিত্বের নিশানা খুঁজতে গিয়ে-

একদিন ধ্রুব তারার পিছু ছুটে হারিয়ে গেলি,

এখনও সূর্য ডোবার শেষ রাতে হয় লক্ষ তারার ভিড়

ঘন মেঘের পালকে হারায় ধ্রুব তারার রূপ।

এখনও রাতে তারার গল্প শেষে

সূর্যের আমন্ত্রনে বসে কোটি পাখির সুমধুর সঙ্গীত,

লাল টুকটুকে রোদ্রোজ্জ্বল শাড়ির আঁচল ছুঁয়ে বয়ে চলে কর্ণফুলি

আবর্তিত সময়ে শরীর গলে বয়ে যায় জ্যোৎস্নার প্লাবন।

তোর নাটকের সমস্ত দৃশ্যপটগুলো

সাজানো আছে আগের মতো

খোলা আকাশ, ছল ছল বয়ে চলা জল

গড়িয়ে যাওয়া মানুষের স্রোত-

শুধু দৃশ্যমান নেই সেই শৈশবের কল্পনার আকাশ,

ছুটে চলা দূরন্ত কৈশোরের আবেগী রং

লাশ হয়ে পড়ে আছে যৌবনের রঙ্গীন প্রজাপতি যেন

এখন এখানে আছে এক অদৃশ্য মায়াবী শরীর

নিত্যদিন যার সাথে আমার বসবাস

সে এক অন্য গ্রহ

এখানে নেই কোন মন খারাপের রং

নেই পৃথিবী নামক গ্রহের চিরপরিচিত চেনাসুর

আলোর অব্যক্ত প্রস্রবনে ভাসে মৃত্যুঞ্জয় শরীর

মৃত্যু এখানে নতজানু হয়ে অঞ্জলী দেয়।

সুবিনয়,

যারা এই পৃথিবীতে মৃত্যুর জন্য আসে

এখানে তারা মন খারাপের ক্যানভাসে আঁকে-

দুঃখের আকাশ।

মেঘের পালকে ভাসায় আশা-নিরাশা-

পাওয়া না পাওয়ার রকমারি উপাদান,

স্বপ্নরা বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়ে মাটির বুকে

জন্ম দেয় আকাঙ্খার বিষ বৃক্ষ আর ফল

মৃত্যুর স্রোতে ভাসে মানুষের স্বপ্ন আর কল্পনা

এই সব তোর জন্য নয়।

যারা ভেসে যেতে চায় যাক, ধাবমান কালগ্রহে

মৃত্যুঞ্জয় শরীর যেখানে ভাসে আলোর প্রস্রবনে

আর মৃত্যু যেখানে নতজানু হয়ে

অঞ্জলী দেয় ঠিক সেইখানে…

৪.
কর্ণফুলী

আমি জন্ম নিতে চেয়েছিলাম তোর কাছে

আর দশটা ফুল লতা-পাতা যেভাবে জন্ম নেয়,

মাটির জঠর ছিঁড়ে আকাশ ছুঁতে চায়-

যেভাবে তোকে দেখবে বলে,

তার বেশিকিছু আমারও চাওয়া ছিলো না।

ঘন সবুজের ছেঁড়া শাড়ির ফাঁকে বয়ে চলে

লিকলিকে সাদা নদীর শরীর

এই পুষ্ঠিহীন নদীর শরীরে ঝাপ দিয়ে

আমার কৈশোর-যৌবনের কত দাপাদাপি ছিল

আজ মৃতপ্রায় শরীরটাকে লজ্জায় ঢেকে

রাখতে চাস বিবর্ণ সবুজের ছেঁড়া আঁচল টেনে,

দুই তীরে আছে আমার স্মৃতির কবর

ওরা জ্যোৎস্নার পালক ছুঁয়ে আমাকে স্বপ্নের

আকাশে ভাসায়

আমি দেখতে পাই ধবধবে সাদা গাঙচিল

ভেসে যায় তোর কোলে।

পূর্ণিমার রাত

অজস্র রূপোলি মুক্তোর ঢেউ ভাসে বুকে

সাম্পানের মায়াবি সুর ভেসে যায় দূর থেকে দূরে

আমি দূর দেশে উড়ে যেতে যেতে

তোর কাছে ফিরি।

কর্ণফুলী

যারা বেঁচে থাকতে চায় তোকে ছিঁড়ে খুঁড়ে-

মৃত্যুঞ্জয় অট্টালিকার সাম্রাজ্যের নেশায়,

তাদের নিয়ে অগণিত মৃত্যু স্রোত বয়ে যায়

কালের গহ্বরে…


৫.
ঘ্রাণ

ঠিক দেখিস,

একদিন এই পাহাড় নদীর দেশ ছেড়ে

তোর কাছে উড়ে যাবো,

পেছনে পড়ে থাকবে গাছের ছায়ার মতো বর্ণহীন স্মৃতি।

এই এতো গল্পের দৃশ্যপট, সাজানো উপন্যাসের বড় অধ্যায়

সবকিছু থেকে যাবে এখানে,

থেকে যাবে মধ্যরাতের আলো-আঁধারি ছায়া

উড়ে যাবে জ্যোৎস্নারা-

পৌষালি উনুনের ধোঁয়ার মতো।

বাসর ঘরের ফুল আর কর্পূরের গন্ধ বিবর্তিত হয়ে

বাতাসে ভাসবে পোড়া-মাংসের ঘ্রাণ,

আকাশে উড়বে স্মৃতির ধবধবে সাদা মেঘ।

সুবিনয়,

তোর সাথে একদিন

এই মাটির পৃথিবীতে আমাদের বোঝাপড়া ছিল,

দুজন হেঁটে যেতে যেতে

গাছ নদী পাহাড় আর ঘন সবুজের বনে

তোকে হারিয়ে কাঁদতাম আনমনে

আবার দেখা হলে আলিঙ্গনে

ভাসতাম নদীর কোলে

নদীরা মা হয় সারাদিনের ক্লান্তি আর ময়লা ধূয়ে

ভিজে আঁচলে শরীরে বুলিয়ে দেয় শীতল পরশ।

এই গ্রহে এখন অজস্র নদীর কবর

আমাদের শরীর ঢাকে ক্লান্তি আর ময়লার স্তুপ

যত্রতত্র খুঁজি মায়ের শীতল আঁচল

হারিয়ে যাওয়া পথ-

বিবর্তিত শৈশব

অচেনা শহরে খুঁজি তোর মুখ

এক খণ্ড অনাত্মীয় সময় মেঘ হয়ে ভেসে চলে

দূর থেকে দূরে।

এই শহর আমাকে চেনে না, চেনে না কেউ

আমিও পালাবো আততায়ি এ শহর থেকে

ভেসে যাবো অজস্র মানুষের ঢেউয়ের ভেতর।

তন্ন তন্ন করে খুঁজবো তোর মুখ,

খুঁজবো দুজন- আমাদের ফেলে আসা সুখ

অসংলগ্ন সময়ে

মধ্যরাত্রির ক্ষণে ডেকে ওঠে জীবনানন্দের চিল

ঘুমচোখে হঠাৎ খুঁজে ফিরি বনলতা সেন

আবছা ছায়ায় ভাসে দারুচিনি দ্বীপ

এই সব এখন মৃত শহরের গল্প।

এখানে কেউ কি বেঁচে আছে?

খুঁজি ফিরি বেঁচে থাকা মানুষের ঘ্রাণ।


Discover more from পথের দাবী

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

Popular

More like this
Related

শিল্প পরিক্রমায় শিল্পের সাম্পান: শিল্পীর প্রেম, ভালোবাসা, উপলব্ধির গভীরতা— আলোড়িত করতে পারে জনপদ

শিশির মল্লিক শিল্পদর্শন, শিল্পপাঠ কিংবা শিল্প আলোচনা/সমালোচনা— দর্শক, পাঠক, আলোচক...

গিওর্গি প্লেখানভ: মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ব্যাখাকার, প্রয়োগে পথভ্রষ্ট পথিক; তবুও মার্কসবাদের শিক্ষক হিসেবে সমুজ্জ্বল

গেওর্গি প্লেখানভ (জন্ম: ১১/১২/১৮৫৬-মৃত্যু: ৩০/৫/১৯১৮) রাশিয়ার মার্কসবাদী তত্ত্বিক, দার্শনিক, রাজনীতিক...

চিত্রশিল্পী মহিউদ্দিন আহমেদের শিল্প উপাখ্যান:প্রকৃতি-পরিবেশের ওপর সমাজ-সভ্যতার আগ্রাসন নিরোদের আহ্বান।

শিশির মল্লিক সমাজে শিল্পের ভূমিকা নিয়ে সমাজ-রাষ্ট্রের বোঝাপড়ার যথেষ্ট ঘাটতি...