
কবি অনার্য নাঈম অত্যন্ত রাজনীতি ও সমাজ সচেতন কবি। তাঁর লেখায় বিষয়কে অর্থপূর্ণ করে তোলার সচেতন প্রয়াস লক্ষ্যণীয়্। একটি দৃশ্যমান বিষয় সাধারণের মধ্যে অভ্যস্থতার কারণে উপেক্ষণীয় হলেও কবির চোখে তার অন্তরনির্যাস রাজনৈতিক দ্যোতনায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে- যাকে তিনি শব্দবন্দে কবিতার শরীর নির্মাণের কাজে লাগান। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত লেখা সচেতন পাঠক মাত্রই শিল্পরস আহরণে আনন্দিত হবেন বলা যায়।
পাঠ নিয়েছেন বাংলাভাষা ও সাহিত্যে। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি লেখালেখি ও নিয়মিত পাঠাভ্যাস তাঁর সৃজনশীল চর্চাকে গতিশীল রেখেছে। তিনি বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি এবং ‘নী’ নেতিক দর্শনের কাগজের সাথে যুক্ত আছেন। শূণ্যদশক থেকে তিনি লেখালেখি করছেন। ইতোমধ্যে তার চারটি কবিতার সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। অগ্রন্থিত কবিতার এখানে পাঁচটি পাঠকের জন্য প্রকাশ করা হলো।
সাঁতার
পাখিরা সাঁতার কাটে বাতাসে
মাছেরা সাঁতার কাটে জলে
কে জানতো আমরা পৃথিবীতে এসে
সাঁতার কাটবো শূন্যে?
ক্যামেরা-ক্লোজ শটে
স্মৃতি ধরে রাখে সেইসব
নাবালোক কাকতাড়ুয়া।
শততম আয়ুবর্ষে পৌঁছে গেলে
মহাশূন্য ভর করে
কোয়ান্টাম যাদুবিদ্যায়
কোনএক শরতের সন্ধ্যায়
কলম কেটে কেটে
সময়কে লিখতে থাকি ম্যাগনেটিক কাগজে;
পরদিন ধুসর দুপুরবেলা
নিমগ্ন ঘোলাটে চোখের রেটিনা বেয়ে
নেমে আসে মাবিয়ার সুদীর্ঘ সম্মতি
ঈশ্বর প্রদত্ত খরায় পুড়তে থাকে মাবিয়ার মায়াপ্রস্থ
একটা পুরুষদেহ মায়াপ্রস্থ বিনির্মাণে
সাঁতার কাটে মাবিয়ার সমস্ত শরীরে।
রোদের কপালে টিপ দিয়ে
হাত ফসকে সময় বেরিয়ে যায়
তক্ষ্মশীলার পাঠ্য বইয়ে সাঁতারের অধ্যয় পাঠ
অসমাপ্ত থেকে যায় যুবকের পাঠে
রক্তে প্রেমের প্রজ্ঞা নিয়ে বাড়ি ফিরে এলে
মৌচাক ফেলে সমস্ত মৌমাছিরা চলে যায় দূরে—
আরো দূরে।
দ্বিপ্রহর বয়ে যায় মাবিয়া,
সাঁতার থামাও!
আমি এখনো অপেক্ষায়।
২৩.০৯.২০২৫
মাবিয়া সুলতানা
সকল দৃশ্যকে একা রেখে
সরিষা ফুলের হাত ধরে দু’মাইল হাঁটি
অযথায় ঘামের গন্ধে বিচলিত হই
এই যে হাঁটার দৃশ্য
এই যে হাত ধরাধরি
যেন অদূরেই অপেক্ষায় আছে গন্ধম ফল।
অতঃপর স্বর্গচ্যুত হলে
মাবিয়া সুলতানার চুল বেয়ে
নেমে আসি মর্তে
মর্তের পুঁজিবাজারে আমি
বিক্রি হয়ে যায়
মাবিয়া সুলতানার চুল বেয়ে
পুঁজিবাজার উর্দ্ধমূখী হয়
এই চিন্তায় কাটে কার্ল মার্কসের নির্ঘুম রাত।
মাবিয়া সুলতানা নিশ্চিন্তে ঘুমায়
এঙ্গেলস যুদ্ধ করে সম্মুখ সমরে
লেনিন বিল্পব কাঁধে নিয়ে—
সমাজতন্ত্রের কক্ষপথে ঘুরতে থাকে
একশ বছর।
আমি পুনরায় সকল দৃশ্যকে
একা রেখে হাঁটতে থাকি
সরষে ফুলের হাত ধরে
যে দৃশ্য বিগত বিগত দশকের
ফ্রেমে বন্দি হয়ে আছে।
১৮.০১.২৫
মুদ্রাস্ফীতি আমাদরে সিপাহসালার
মুদ্রাস্ফীতির সবুজ মাঠে
উদ্ভ্রান্ত ভেড়াদের মতো
আমরা খাদ্য খুঁজে বেড়াই,
আমাদের খাদ্যগুলো ক্রমান্বয়ে
আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
মুদ্রাস্ফীতির সবুজ মাঠে
এই মায়াবতী রহস্যময়ী মুদ্রা
রাজ্যের সিপাহসালার হয়ে
প্রজাদের শিশ্ন চেপে ধরে আছে।
আমরা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ
ও জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে করতে
নিজেদের বুকের হাড়গুলো বের করে ফেলি।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অংক স্যার
হাড়গুলো গুনে গুনে অংক শেখায়
রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ সন্তানদের,
মুদ্রাস্ফীতির টগবগে ঘোড়া
আমাদের নিয়ে যাচ্ছে
আশ্রায়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর দিকে
মৃত্যুর পূর্বে রষ্ট্রের পক্ষ থেকে
ওটাই আমাদের শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার।
০৮.০৫.২০২৪
স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ
আমিই ব্যঞ্জনবর্ণের ব্যঞ্জন
আমার ভিতরে লুকিয়ে আছে স্বরবর্ণ;
অথবা বলতে পারো
স্বরবর্ণ আমার সার্বভৌমত্ব—
তার উপস্থিতি ছাড়া আমি অস্তিত্বহীন
তোমরা তার কোন অবদান অস্বীকার করবে?
আমিই অল্পপ্রাণ মহাপ্রাণ ঘোষ অঘোষ ধ্বনি
আমার অস্তিত্বে লুকিয়ে আছে ব্যাকরণ
অথবা প্রত্যাশিত বাক্যের শৃঙ্খলা
তোমরা আমার কোন অবদান অস্বীকার করবে?
আমিই বর্ণমালা অতপর শব্দ
তারপর একগুচ্ছ রমণীয় শব্দ নিয়ে
হয়ে যায় বাক্য অথবা তারও অধিক
আমিই মনের ভাব; মন ও দেহের
সংযোজক অব্যয়, এক ও একের অধিক
তোমরা আমার কোন অবদান অস্বীকার করবে?
একদিন আমি ও স্বরবর্ণ
ভাষার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলাম
ভাবলাম দুজনে সংসারী হবো
ঘর বাঁধবো সাজানো বাগানের মতো
শৃঙ্খলাহীন তরঙ্গের দোলায়
দুলতে দুলতে পরবাসী হবো
এরই মধ্যে চলে এলো উনিশশ বায়ান্ন
আমাদের আর যাওয়া হলো না।
২৭/১২/২০
তোমার সৌখিন পায়রাগুলো
তোমার সৌখিন পায়রাগুলো কী এখনো আকাশে ওড়ে?
মাঠে যায়? বনে যায়?
নাকি লুকিয়ে থাকে ওড়নার আড়ালে?
বিগত শতাব্দীতে পায়রার আরেক নাম ছিল ডাকপিয়ন।
তোমার কী কোন প্রেমিক ছিল?
যে তোমার পায়রাগুলোকে দুহাতে ধরেছিল
এবং পায়রার মুখে ঠোঁট দিয়ে
অনুসন্ধান করেছিলো কোন অদৃশ্য গরল
তোমার মেধাবী পায়রাগুলো উঁকি দেয়
চোখের সামনে, চোখের পিছনে, চোখের গভীরে।
তোমার সৌখিন পায়রাগুলো এখন
আকাশ থেকে নেমে আসে ধানক্ষেতে-
তারপর অদৃশ্য হয়ে যায় ওড়নার আড়লে।
০৩/০২/২১
নির্জন দুপুর
একসময় দুপুরেরমধ্যে নির্জনতা ছিল
কবিতা লিখতাম ‘নির্জন দুপুর’।
এখন আর কোথাও নির্জনতা নেই
না দুপুরে, না গভীর রাতে;
শুধুই কোলাহল চারিদিকে
আবারিত দূষণের চিত্রকলায়
ছেয়ে গেছে দেশ, ধূসর ক্যানভাস।
বন-বনানীর সবুজ ঘেরা শান্ত দিঘি,
মাটির প্রতিটি বর্গমিটার
এখন ব্যাস্ত নগর।
হয়তো একদিন ঘোষণা করা হবে
গোরস্থানই এদেশের একমাত্র নির্জন স্থান।
২৪.০২.২৩






