
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ সমকাল
বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশ জাসদের উদ্যোগে বাম ও উদারনৈতিক বিভিন্ন দল ও সংগঠন নিয়ে সম্প্রতি ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ২৯ নভেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে বৃহত্তর এ জোট গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। আপাতত ৯টি দল যুক্ত হলেও আগামী দিনগুলোতে আরও অনেক দল ও সংগঠন এতে যুক্ত হবে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। মূলত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এ জোট গঠিত হলেও একসঙ্গে তারা আন্দোলনও গড়ে তুলবে।
প্রশ্ন হতে পারে, বামপন্থিরা তো বিশেষত স্বাধীনতার পর থেকে জোট গড়া-ভাঙার মধ্যেই আছে; নতুন এ জোট গঠনের উদ্যোগ কেন? এর উত্তর আছে কনভেনশনের খসড়া ঘোষণাপত্রে, যেখানে নতুন জোট গঠনকে ‘দেশের সকল দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল-বাম রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গ, আদিবাসী তথা বিভিন্ন জাতিসত্তা, নারী সংগঠনসমূহ, শ্রম-কর্ম-পেশার সংগঠনসমূহ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহসহ, অধিকার আন্দোলনের কর্মী এবং অপরাপর সব শক্তির সম্মিলনে’ জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। (সমকাল অনলাইন, ২৯ নভেম্বর)
আমার দৃষ্টিতে, বিশেষত গত তিন দশকে এবারই প্রথম বামপন্থিরা সংগ্রামের বন্ধু নির্বাচনে নিজেদের গতানুগতিক চিন্তার বাইরে এলো। আরও সঠিকভাবে বললে, পরিস্থিতির ডাকে সাড়া দিল।
যে কোনো রাজনীতিরই প্রধান লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। এ ছাড়া নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়ন তো দূর স্থান, প্রকৃত অর্থে জনসেবাও সম্ভব নয়। ফলে অতীতে যখনই ক্ষমতা দখলের প্রশ্ন এসেছে তখনই বামপন্থিরা মূলত শ্রেণিসংগ্রাম বিষয়ে যান্ত্রিক উপলব্ধির কারণে শুধু বাম মিত্র খুঁজেছে।
হ্যাঁ, বিগত আশির দশকে সামরিক শাসনবিরোধী লড়াইয়ের জন্য বাম দলগুলো দুভাগ হয়ে শাসকশ্রেণির দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগে ও বিএনপির সঙ্গে মিলে যথাক্রমে ১৫ দল ও ৭ দলীয় জোট গঠন করেছিল। আবার ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য ১৫ দলভুক্ত বাম দলগুলোর একটা অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে গেলেও অন্যরা বামপন্থিদের নিজস্ব শক্তি গড়ে তুলতে পাঁচ বাম দল গঠন করে। এই পাঁচ বাম দলে পরবর্তী সময়ে সাত দলভুক্ত বামপন্থিরাও যুক্ত হয়। এ পাঁচ বাম দলই ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা বাম দলগুলোসহ বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠন করে। এ জোটের মূল লক্ষ্য ছিল শ্রমিক-কৃষকসহ শোষিত মেহনতি শ্রেণির নিজস্ব শক্তি গড়ে তোলা।
১৯৯০ দশকের শেষার্ধে গণফোরামসহ কতিপয় উদারপন্থি দলের সঙ্গে মূলধারার বাম দলগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে ১১ দল গঠন করেছিল, এটাও সত্য। তবে সে জোট ছিল বাম দলের বাইরে কিছু নির্দিষ্ট উদারপন্থি দলেই সীমাবদ্ধ, এটাও সত্য। মোদ্দা কথা, এবার যেভাবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আপাত অরাজনৈতিক সংগঠনকেও রাজনৈতিক জোটে নেওয়া হয়েছে, সেটা আগে কখনোই দেখা যায়নি।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এবার বামপন্থিরা তাদের গতানুগতিক দ্বিদলীয় বৃত্ত ভাঙার স্লোগানের ‘বৃত্ত’ ভাঙার চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নিজেদের ভিত গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এ জন্য এমনকি বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সংগঠনেরও সঙ্গে কথা বলছেন তারা। সম্ভবত এটাকেই কনভেনশনে দেওয়া বক্তব্যে সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ‘রেইনবো কোয়ালিশন’ গড়ার লক্ষ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থাৎ বাম দলগুলো বৃহত্তর জনভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করতে পেরেছে এবার।
ভোটের ক্ষেত্রে এ মানুষদের বড় অংশই হয়তো আওয়ামী লীগের সমর্থক; তাদের কেউবা হয়তো পরে বিএনপির সমর্থক। তবে বামপন্থিরা যখন ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার প্রশ্নে কনভেনশনের ঘোষণায় বর্ণিত দল ও সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে নামবে, তখন একদিকে বামপন্থিদের সঙ্গে ওই দল ও সংগঠনভুক্ত মানুষদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে দানা বাঁধবে। অন্যদিকে ভোটদানের প্রশ্নেও এসব মানুষের মধ্যে নতুন উপলব্ধি ঘটবে।
নামের ক্ষেত্রেও কিন্তু অভিনবত্ব আছে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে এ যুক্তফ্রন্টকে মেলানো যাবে না, জানি। তবে এটাও তো বলা যায় যে, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট যেমন তৎকালীন শাসক মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে সব বিরোধী দলের ঐক্যবদ্ধ মঞ্চ ছিল, গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টও এ সময়ে কার্যত সব বিরোধী শক্তিরই মঞ্চ। এখন তো বামপন্থিদের বাইরে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ প্রায় সব দলই অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে।
অনস্বীকার্য, সর্বশেষ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অনেকেই ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে চলে গিয়েছিল। ফলে বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে কিছুটা সাড়া ফেলার পর ১১ দলের অপমৃত্যু ঘটে। তখন এ নিয়ে বাম দলগুলোর মধ্যে বেশ তর্কবিতর্ক হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে তা তিক্ততারও পর্যায়ে গিয়েছিল। অনুরূপ তিক্ত অভিজ্ঞতা নতুন জোটের ক্ষেত্রে ঘটবে না– এর নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।
এটাও তো স্বীকার করতে হবে, নতুন জোট একটা বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতায় গঠিত হয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে দেশের উদারপন্থিদের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সংগঠন হিসেবে প্রায় অনুপস্থিত। পরিস্থিতি এমন যে, পুরো উদারপন্থি শিবিরই একপ্রকার বিপন্ন পরিস্থিতিতে। দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধ হয়নি। তদুপরি শ্রমিক-কৃষকের বঞ্চনা যে কোনো সময়ে চেয়ে বেড়েছে; নারী, সংখ্যালঘু, বাউল, এমনকি শহুরে সংস্কৃতিকর্মীর টিকে থাকার অধিকারও খর্ব হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানের চার মূলনীতি যেভাবে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে, তা নজিরবিহীন। অথচ এসব নিয়ে কথা বলারও কোনো শক্তি নেই। বামপন্থিদের নতুন জোট নিঃসন্দেহে এ ক্ষেত্রে বড় ভরসা জোগাতে পারে।
এর আগে এক নিবন্ধে অন্য অনেকের মতো আমিও এ প্রসঙ্গে শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দিয়েছিলাম। সেখানকার বামপন্থিরা এই কৌশল অবলম্বন করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাসীন দল ‘জনতা বিমুক্তি পেরামুনা’র উদ্যোগে গঠিত জোটে আছে জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য ডাক্তার, ইন্টার কোম্পানি এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন, গণ-গাইডিং শিল্পী, জাতীয় বুদ্ধিজীবী সংস্থা, সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রগতিশীল মহিলা সংঘ, অল সিলন এস্টেট ওয়ার্কার্স ইউনিয়নসহ ২২টি সংগঠন। এমনকি উদারপন্থি বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের সংগঠন ভিক্ষু ফ্রন্টও সে জোটে আছে।
নিঃসন্দেহে শ্রীলঙ্কাকে হুবহু অনুসরণ বাস্তবসম্মত নয়। কারণ দক্ষিণ এশীয় হলেও দুই দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় ফারাক রয়েছে। উপরন্তু হয়তো আগামীকালই এ ধরনের কোয়ালিশন গড়ে উঠবে না। খোদ জোটভুক্ত শরিক দলগুলোরই মধ্যে ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে মাঠের সংগ্রামের পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সে ভিন্নতা কমে আসতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাম গণতান্ত্রিক জোট, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা, বাংলাদেশ জাসদ ও জাতীয় গণফ্রন্ট মিলে যমুনা অভিমুখে যে পদযাত্রা কর্মসূচি দিয়েছে, সেটাকে শুভ সূচনা হিসেবে ধরা যেতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের কাছে জনমত উপেক্ষা করে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি। ধারাবাহিকতা রক্ষা হলে এ ইস্যুই সংশ্লিষ্ট বাম দলগুলোকে যেমন পরস্পরের আরও ঘনিষ্ঠ করবে, তেমনি আরও বহু দল ও সংগঠনকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে। মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চার সব দল এখনও নতুন জোটে যোগ দেয়নি। জাতীয় গণফ্রন্টও এ জোটে আসেনি; তথাপি দলগুলো জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় একত্রে সংগ্রাম করছে।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল





