আফজাল হোসেন

আফজাল হোসেন। তাঁকে চিনিয়ে দেয়ার কিছু নেই। তিনি আমাদের সংস্কৃতি জগতের নন্দিত শিল্পী। অভিনেতা হিসেবে অধিক পরিচিত হলেও তিনি মূলত চিত্রশিল্পী। কিন্তু আমরা তাঁর আরো একটি গুণ প্রবলভাবে লক্ষ্য করছি। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব ছোট ছোট গদ্য লিখছেন, অত্যন্ত সহজ সাবলীল ভাষায়। বিষয়ের বৈচিত্র সমসাময়িক সময়ের অস্থির রাজনৈতিক সামাজিক পরিবেশের এ যেন উপশম সম থেরাপি। তাঁর দূরদর্শী চিন্তন ও মননের ব্যাপ্তি আমাদের তাঁর প্রতি আরো আগ্রহী ও শ্রদ্ধাশীল করে তুলেছে। একজন শিল্পী যে, তার শিল্পের ভাষায় সমাজের অসঙ্গতিকে যৌক্তিক ও নান্দনিকভাবে বিবেচনার জন্য প্রস্তাব করতে পারেন, প্রকাশ করতে পারেন- তা অতুলনীয়। তাঁর অনুমতি নিয়েই আমরা তাঁর এই লেখাটি প্রকাশ করলাম আমাদের পোর্টালে।
মানুষে মানুষে মতের মিল থাকলে দুনিয়াবাস হতো লবন ছাড়া তরকারির মতো বিস্বাদ..
মানুষে মানুষে মতের মিল থাকলে দুনিয়াবাস হতো লবন ছাড়া তরকারির মতো বিস্বাদ। মোটেও তা আনন্দের, বিশেষ হতো না। দুটো আম কিংবা দুটো কামিনী ফুল গাছের চেহারা এক নয়। রঙে আকৃতিতে হুবহু এক হয় না এক গাছের একই ডালের দুটো গোলাপ।
মেশিনে বানানো সমস্তকিছু হুবহু একরকমের দেখতে হয়।
মানুষ, গাছ, ফুল, প্রাণী পশু ইত্যাদি মেশিনে বানানো নয়।
সৃষ্টিকর্তার রচনা করা পৃথিবীতে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ চায়, অন্যের মত নিজের মতের সাথে মিলতে হবে। তা ডাকাতের মতো চাওয়া। মত না মিললে ভিন্নমতের মানুষদের দুনিয়া ছাড়া করে দিতে চায় মানুষ। পৃথিবী একা মানুষের নয়। হোক সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, মানুষ জগতের একচ্ছত্র মালিক নয়!
গরু ছাগল. বাঘ সাপ, ব্যাঙ কিংবা মাছ সকল পশু প্রাণী জন্মগ্রহন করে পৃথিবীতে। তাদের দেশ, গ্রাম নেই। কারো জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যুর প্রত্যয়নপত্র, পরিচয়পত্র লাগে না। সকলেই পৃথিবীর।
মানুষের মতো নেই তাদের কোনো সংগঠন, দল। নির্দিষ্ট আদর্শে উজ্জীবিত নয় তাদের মন। তাই প্রাণী পশু, গাছ ইত্যাদি কারো মনেই নেই হীনমন্যতা, ঈর্ষা, হিংসা, ক্ষোভ, ঘৃণা। বাঁচা, টিকে থাকার জন্য তাদের অনেককে অনেকরকম লড়াই করতে হয় কিন্তু তারা ধর্ম, জাত পাত নিয়ে মারামারি কাটাকাটি করে না।
কোনও বাঘ দাবী করে না, আমি খুব ধর্মপ্রাণ, সৎ, ভালো জাতের বাঘ, তুমি ভালো না। বলা লাগে না কারণ, প্রাণী পশুদের মধ্যে ভান নেই। সবাই যার যার নিয়ম মেনে চলে। ন্যায় অন্যায় না চিনুক লাভ লোকসানের হিসাব কষে জীবন কাটাতে হয় না তাদের। দুনিয়ায় তাদের সমান অধিকার।
কুমীর দাবী করে না, আমি পানিতে থাকি, আমিই পানির রাজা। সাপ বলে না, আমি গর্তের রাজা। মানুষের মাথায় বেশি বুদ্ধি দেয়া আছে তাই কারণ অকারণে সকল দিকে তারা বুদ্ধি খাটায়।
মানুষই চাঁদ বা বাঘকে মামা, সিংহকে বনের রাজা বানায়। মানুষই মানুষদেরকে দোষী নির্দোষ, ধর্মের এবং অধর্মের বানায়। নিত্য নানা কায়দায় মানুষই মানুষকে ভাগ করে। দলের বানায়, পক্ষের বানায় এবং বানায় প্রতিপক্ষ।
কখনো কেউ শোনেনি, পশু প্রাণীরা জগতের অশান্তির কারণ। শোনা হয় না পরের দোষের বিচার করার জন্য তারা সদা মুখিয়ে থাকে। মানুষদের মতো ইহকাল ও পরকাল নিয়ে ভাবতে হয় না তাদের। মানুষের তুলনায় তারা পেয়েছে কম। কম পেয়ে তাদের কেউই অসুখী, অসন্তুষ্ট, হতাশায় আক্রান্ত নয়।
জগতে বেশি পেয়েছে মানুষ, মানুষেরাই জগতে যত অশান্তি উদ্বেগের কারণ।
মানুষেরা ধৈর্য্য পেয়েছে, চিন্তার শক্তি পেয়েছে, জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতা পেয়েছে। একইসাথে তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে, বিনয়ী হও, সন্মান করো, দোষ করো না, মিথ্যা বলো না, সততা বজায় রাখো। এসব কেনো বলা হয়েছে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বিশেষণ পাওয়া মানুষদের মনে কী প্রশ্ন জাগে?
যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনি তো জানেনই, সামলাতে হবে মানুষদের। তারাই জগতের জন্য ভয়ানক, বিপদজনক।





